জামিন নিয়ে বাসায় ফিরলেন খালেদা

 
 
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রবিবার আদালতে হাজির হয়ে জামিন পেলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেনি।
 
জামিন ছাড়াও শুনানি মূলতবি ও জব্দ তালিকার নথির সত্যায়িত অনুলিপি সরবরাহের আবেদনও মঞ্জুর করেন বিচারক। জামিন নিয়ে খালেদা জিয়া আদালত থেকে সরাসরি গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’য় ফেরেন। গত ৩ জানুয়ারি থেকে ঘটনাবহুল টানা ৯২ দিন গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থানের পর অবশেষে তিনি বাসায় ফিরলেন।
 
মামলা দুটিতে আদালতে হাজিরা দিতে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে আদালতের উদ্দেশে গুলশানের কার্যালয় থেকে বের হন বিএনপি চেয়ারপারসন। এসময় তার সঙ্গে একই গাড়িতে ওঠেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা ও বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। এই তিনজনও এতদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার কার্যালয়েই ছিলেন।
 
এক ঘণ্টা আদালতে খালেদা জিয়া
 
বকশিবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত-৩ এ সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে হাজির হন খালেদা জিয়া। মিনিট দুয়েক পর এজলাশে আসেন বিচারক আবু আহমেদ জমাদার। শুরুতেই ব্যারিস্টার এম. মাহবুবউদ্দিন খোকন বিচারকের কাছে খালেদা জিয়াকে বসতে দেয়ার অনুরোধ জানান। বিচারক অনুমতি দিলে কাঠগড়ার সামনে রাখা একটি কাঠের চেয়ারে বসেন খালেদা জিয়া। এরপর দুটি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে আবেদন দাখিল করা হয়।
 
খালেদা জিয়ার আইনজীবী মাহবুবউদ্দিন খোকন বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন এই দুটি মামলার আসামি। ইতোপূর্বে গত ২৪ ডিসেম্বর এই আদালতে হাজিরা দিতে আসার ও যাওয়ার সময় একটি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতিতে তার গাড়ি বহরে হামলা করে। এজন্য উনি নিরাপত্তাহীনতার কারণে আদালতে আসতে পারেননি। আদালতের প্রতি উনার শ্রদ্ধা রয়েছে।
 
অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজির না থাকার কারণে খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু উনি নিরাপত্তাহীনতার কারণে আদালতে হাজির হতে পারেননি, সেটি আমরা সকলে অবগত। দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় আজ স্বেচ্ছায় আদালতে আত্নসমর্পণ করে তিনি জামিন চেয়েছেন।
 
এ পর্যায়ে বিচারক বলেন, আপনাদের (আসামি পক্ষ) মধ্য থেকে আরো কেউ কিছু বলবেন? তখন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, খালেদা জিয়া আদালত ও আইনের প্রতি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধাশীল। আদালতের প্রতি অবজ্ঞা করে তিনি অনুপস্থিত থেকেছেন একথা ঠিক নয়। আমরাই তাকে উপদেশ দিয়েছিলাম নিরাপত্তাহীনতার কারণে আপনার আদালতে যাওয়া ঠিক হবে না। আজ আদালতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন।
 
এ পর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি এসেছিল। ৬৫টি কার্যদিবসের মধ্যে এ পর্যন্ত ৭টি কার্যদিবস তিনি আদালতে হাজির ছিলেন।
 
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তিনি স্বেচ্ছায় আত্নসমর্পণ করে জামিন চেয়েছেন। আসলেই তিনি জামিন পাওয়ার হকদার। জামিন পেতে পারেন। আমরা আশা করব সামনের দিনগুলোতেও আদালতে হাজির থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন মামলার বিচার কার্যক্রমে আদালতকে সহায়তা করবেন।
 
উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শেষে বিচারক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি প্রসঙ্গে বলেন, খালেদা জিয়া ছাড়াও এই দুটি মামলার অপর দুই আসামি কাজী সালিমুল হক ও শরফুদ্দিন আহমদ ইতোপূর্বে আদালতে হাজির ছিলেন। কিন্তু গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা গরহাজির ছিলেন। আমি তো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না দিলে এই মামলার বিচার যে এগোনো সম্ভব নয়; রাষ্ট্রপক্ষের এমন দাবির সঙ্গে আমিও একমত। তাই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে পরোয়ানা জারি করা হয়।
 
তিনি বলেন, আদালত পরিবর্তনের জন্য খালেদা জিয়ার দুটি আবেদন হাইকোর্টে বিচারাধীন। যদি উচ্চ আদালত থেকে কোনো স্থগিতাদেশ আসে তাহলে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি বিচার কার্যক্রম পরিচালনা না করতে বাধ্য। কিন্তু যদি স্থগিতাদেশ না থাকে তাহলে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে কোনো আইনি বাধা নেই।
 
বিচারক বলেন, আদালত জামিন দেবে। তবে আসামিদেরকে আদালতে হাজির হতে হবে বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার জন্য। তারেক রহমান আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। খালেদা জিয়াও আইনে বর্ণিত একই সুযোগ নিতে পারেন। এ ধরনের কোনো আবেদন আসলে আদালত অবশ্যই তা বিবেচনা করবে।
 
বিচারক বলেন, খালেদা জিয়া সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাকে জেল হাজতে প্রেরণের কোনো উদ্দেশে নেই। ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণে নির্দোষ প্রমাণিত হলে তিনি খালাস পাবেন। তিনি ন্যায়বিচার পান, এটিই আদালতের প্রত্যাশা। একইসঙ্গে দুটি মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করা হলো। তিনি আগে যেভাবে জামিনে ছিলেন, এখনো সেভাবেই থাকবেন। খালেদা জিয়া ছাড়াও অপর দুই আসামির জামিন মঞ্জুর করে বেলা ১১টা ১৪ মিনিটে আদেশ দেয় আদালত।
 
জামিন মঞ্জুরের পর মামলার বাদীকে জেরা (রিকল) এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখিত জব্দ তালিকার সত্যায়িত অনুলিপি চেয়ে তিনটি আবেদনসহ দাখিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।
 
জব্দ তালিকার অনুলিপি পাওয়ার আবেদনের বিরোধিতা করে দুদকের কৌঁসুলি কাজল বলেন, অভিযোগ গঠনের আগেই আসামি পক্ষ এসব জব্দ তালিকার অনুলিপি চাইতে পারত। কিন্তু তা তারা করেনি। মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে এগুলো দেয়ার সুযোগ নেই। জবাবে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, জব্দ তালিকার অনুলিপি না পেলে সাক্ষীকে জেরা করতে পারব না।
 
এ পর্যায়ে বিচারক বলেন, সাক্ষীকে জেরা করার জন্য এসব নথিপত্র দরকার। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আবেদন মঞ্জুর করে এগুলো আসামি পক্ষকে সরবরাহ করার নির্দেশ দেয়া গেলো। একই সঙ্গে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত মামলার বিচার মুলতুবির আদেশ দেন বিচারক। তখন ব্যারিস্টার এম মাহবুবউদ্দিন বলেন, বার কাউন্সিল নির্বাচনের তফসিল দেয়া হয়েছে। আমরা ব্যস্ত থাকবো। এছাড়া ডিসিসি নির্বাচন ২৮ এপ্রিল। এসব বিবেচনায় এক মাস সময় দিলে ভালো হয়। বিচারক বলেন, ডিসিসি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
 
এজন্য ২৬ এপ্রিলের পরিবর্তে ৫ মে পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম মুলতুবি করা হলো। শুনানিকালে খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, এম. বদরুদ্দাজা বাদল, এম আসাদুজ্জামান, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, মো. আমিনুল ইসলাম, জাকির হোসেন ভুইয়াসহ অর্ধ শতাধিক আইনজীবী আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
 
 
ছবি তোলা নিয়ে বিপত্তি
 
শুনানির এক পর্যায়ে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে খালেদা জিয়া বলেন, মোবাইলের মাধ্যমে কেউ ছবি তুলছেন। দুদক কৌঁসুলি কাজল পেছনে ফিরে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, কে ছবি তুলেছেন বলুন? খালেদা জিয়া বলেন, সাদা পোশাকের কেউ ছবি তুলে থাকতে পারেন।
 
এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, কেউ কেউ মোবাইলে মেসেজ পাঠাচ্ছে বাইরে। তখন উপস্থিত সকলকে সতর্ক করে দিয়ে বিচারক বলেন, এজলাশের ভেতরকার কোনো ছবি তুলবেন না। এটা বেআইনি। শুনানির সময় মোবাইল ফোনে কথাও বলবেন না। কোনো তথ্য মেসেজে বিচার চলাকালে বাইরে সরবরাহ করবেন না। যদি তা করেন এবং কোনো গণমাধ্যমে এজলাশের ভেতরকার কোনো ছবি প্রকাশ বা প্রচার করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
 
কোকোর জন্য সমবেদনা
 
শুনানিতে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোনো প্রসঙ্গ উঠে এলে বিচারক নিজেও খালেদা জিয়ার প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, জামিন আবেদনকারীর কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যুতে ইতোপূর্বে আমরা সমবেদনা জানিয়েছি। পুত্রের মৃত্যুতে পৃথিবীর যে কোনো মা শোকাহত থাকবেন, এটিই স্বাভাবিক। আমি আজও আদালতে বসে তাকে আবারও সমবেদনার বার্তা দিতে চাই।
 
খালেদার জন্য চেয়ার
 
বিশেষ জজ আদালতের কাঠগড়ার সামনে খালেদা জিয়ার বসার জন্য রাখা হয় একটি কাঠের চেয়ার। চেয়ারের উপর দেয়া ছিল তোয়ালে, ছিল একটি কুশনও। সামনে ছিল একটি টি-টেবিল। বিচারক অনুমতি দেয়ার পর চেয়ারে বসেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন সেলিমা রহমান। খালেদা জিয়ার পাশে বসার জন্য তাকেও একটি প্লাস্টিকের চেয়ার সরবরাহ করা হয়।
 
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
 
খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে আদালত কক্ষ, আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নেয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা। তার হাজির হওয়ার পূর্বেই সকাল থেকে আদালত ভবনের আশেপাশের এলাকা এবং সামনের মাঠে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আশপাশের সড়কেও পুলিশ ও র্যাবের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। আদালত কক্ষে প্রবেশের আগে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের দেহ তল্লাশি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।