কামরুজ্জামানের রিভিউ আবেদনের রায় সোমবার

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের সোমবার রায় ঘোষণা করা হবে। রবিবার শুনানি শেষে এ দিন ধার্য করা হয়। শুনানিতে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দন্ড দেয়ারও বিশেষ আবেদন করা হয়।
 
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চে উভয়পক্ষের শুনানি শেষ হয়। এই বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
 
আদালতে কামারুজ্জামানের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন।
 
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সকাল পৌনে ১০টা থেকে শুরু করে মাঝে আধা ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের বক্তব্য শোনেন বিচারকরা।
 
খন্দকার মাহবুব হোসেন প্রধানত চারটি পয়েন্টে তার বক্তব্য উপস্থাপন করে আপিল বিভাগের কাছে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান।
 
তিনি বলেন, ৩ নম্বর অভিযোগে (সোহাগপুর হত্যাকান্ড) কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। মূলত তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এ সাজা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের ১১ নম্বর সাক্ষী ঘটনাটি মুরব্বীদের মুখে শুনেছেন। বাকী দুই জন সাক্ষীকে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী বলা হয়েছে। অথচ জেরায় তারা বলেছেন, তারা কামারুজ্জামানকে প্রথম দেখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর। তাহলে ঘটনার সময় তারা কীভাবে কামারুজ্জামানকে চিহ্নিত করেন?
 
 তিনি বলেন, আমরা ২০১১ এবং ’১২ সালে প্রকাশিত দুটি বই এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছিলাম। বিচার শুরু হওয়ার পর অসত্ উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছে বিবেচনা করে আদালত বই দুটির বক্তব্য নাকচ করেছেন। এখন আমরা ফরিদা আখতারের লেখা, মহিলা মুক্তিযোদ্ধা- নামক একটি বই দাখিল করছি। যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। পরে ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালে এই বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই বইতে মামলার ১৩ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষাত্কার রয়েছে। যেখানে তিনি বলেছেন, তার স্বামীকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনারা।
 
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। সরাসরি জড়িত না থাকার বিবেচনায় আপিল বিভাগ সে সাজা কমিয়ে কারাদণ্ড দেয়। অথচ সরাসরি জড়িত না থাকা সত্ত্বেও আপিল বিভাগই ৩ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। এ বিবেচনায় মৃত্যুদন্ডের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি আবেদন জানান।
 
খন্দকার মাহবুব আরো বলেন, বিশ্ব এখন মৃত্যুদণ্ড থেকে সরে আসছে। একমাত্র নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রায়াল ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুতণ্ডের বিধান ছিল না। আন্তর্জাতিক আইনের এ পরিবর্তন বিবেচনায় নেয়ার জন্যও তিনি আপিল বিভাগে আবেদন জানান।
 
তিনি বলেন, কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তাতে তিনি মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি নন। মূল অভিযুক্তরা হচ্ছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য। প্রধান আসামিকে ছেড়ে দিয়ে সহ-আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় না।
 
অন্যদিকে, অ্যাটর্নি মাহবুবে আলম বলেন, ১৯৭২ সালে প্রকাশিত পত্রিকায় ও এরপর বিভিন্ন ডকুমেন্টে আল বদর কমান্ডার হিসেবে কামারুজ্জামানের নাম প্রকাশিত হয়েছে। তিন জন সাক্ষী যদি সাক্ষ্য নাও দিতেন তবুও কামারুজ্জামানের আল বদর পরিচয় মুছে যায় না। তিনি যেসব জঘন্য অপরাধ করেছেন তার জন্য কোন অনুকম্পা হয় না। ১৯৭২ সালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিলো। তত্কালীন সংবাদপত্রে ঐ সংবাদ প্রকাশিত হয়। আমরা তার তথ্য-প্রমাণও দাখিল করেছি।
 
শুনানির পর মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, কামারুজ্জামান যেসব অপরাধ করেছেন তাতে তার শাস্তি লঘু করার কোন সুযোগ নেই। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনির বলেন, আমরা আশা করি কামারুজ্জামান ন্যায় বিচার পাবেন।
 
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ড দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামান আপিল করেন। গত বছরের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে তার মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে।
 
 গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পরদিন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুপরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
 
গত ৫ মার্চ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন দায়ের করেন কামারুজ্জামান। আসামিপক্ষের সময়ের আবেদনে দুই দফা তারিখ পেছানোর পর গতকাল আপিল বিভাগে শুনানি হয়। রিভিউ আবদেন খারিজ হলে নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।