কালবৈশাখীতে নিহত ৩৭

শনিবার রাতে দেশের অনেক এলাকায় শক্তিশালী কালবৈশাখী আঘাত হানে। গতকাল পর্যন্ত এই ঝড়ের তাণ্ডবে ৩৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে; যার মধ্যে ১৬ জনই বগুড়ায়। এই ঝড়ে সম্পদ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকা বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন ছিল গতকালও। সারাদেশ থেকে ইত্তেফাক সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
 
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ায় ঘূর্ণিঝড়ে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। প্রায় ১৫ মিনিটের এই ঝড়ে জেলায় এ পর্যন্ত ১৬ জনের মুত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে দেয়াল এবং গাছের ডাল  চাপায় ১৪ জন এবং নৌকা ডুবে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের তাণ্ডবে কমপক্ষে ৫০ হাজার ঘরবাড়ি, লক্ষাধিক গাছপালা, ছাড়াও ফসলী জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার টিনের চালা, গাছপালা, বাড়িঘর, প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে পড়েছে। বিদুত্ অবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। শনিবার সন্ধ্যায় ঝড়ের পর থেকে গতকাল রবিবার বিকাল পর্যন্ত কোথাও বিদ্যুত্ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। মোবাইল ফোন  নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
 
ঝড় চলাকালে দেয়াল চাপা, গাছের ডাল, বজ্রপাতে ও বিদ্যুতায়িত হয়ে নিহতরা হলেন বগুড়া শহরের বউবাজার এলাকার আব্দুল ওয়ারেছের স্ত্রী আছিরন বিবি (৫৫), নজরুল ইসলামের মেয়ে নীলা (৩ মাস), সদরের শহরদীঘি এলাকার খাজা মিয়ার পুত্র রজব (১৫), পালশা গ্রামের আইজালের পুত্র পলাশ (১৮), শাজাহানপুর উপজেলার ক্ষুদ্রফুলকোট গ্রামের লুত্ফরের পুত্র আব্দুল মান্নান (৩৫), তায়েব আলীর স্ত্রী রাবেয়া (৬৫), খোয়ারপাড়া বাবলুর কন্যা পায়েল (২), সারিয়াকান্দি উপজেলার বিলপাড়া গ্রামের ইবান আলীর স্ত্রী শান্তা বেগম (৫০), ফুলবাড়ি পূর্ব পাড়ার নূর হোসেনের পুত্র সুজন (৩০), বর্ষাচরের মোজাম মণ্ডল (৩৫) ও সোবাহান (৩৬), কাহালু উপজেলার হারলতা গ্রামের আব্দুস সাত্তারের পুত্র আজিজুল (১৯), আবেদ আলীর পুত্র ইসমাইল হোসেন (৩৮), ধুনট উপজেলায় জোড়শিমুল উত্তরপাড়া গ্রামের মৃত ফয়েজ উদ্দিনের পুত্র আফজার হোসেন (৬০), সোনাতলা উপজেলার লোহাগাড়া গ্রামের মোকো প্রামাণিকের স্ত্রী ফিরোজা বেওয়া (৫৫) এবং গাবতলী উপজেলার তেলিহাটা গ্রামের আদর উদ্দিনের স্ত্রী সামিয়া (৫২)।
 
শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে হঠাত্ করে জেলা শহরের পশ্চিম দিক থেকে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বহু কাঁচা ঘরবাড়ি উড়ে গেছে। গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। ফসলী জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
 
ঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে কয়েক হাজার পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। জেলা প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মাহবুবর রহমান। শহরের বহুতল ভবনগুলোতে বিদ্যুত্ না থাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। গোসল, রান্না, পানি পান সব কিছুই প্রায় বন্ধের উপক্রম।
 
বগুড়া বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হযরত আলী জানান, ঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শনিবার রাত থেকে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আরো কতক্ষণ এভাবে জেলা বিদ্যুত্ বিছিন্ন থাকবে সেটিও তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
 
নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোর সদরসহ বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, বাগাতিপাড়া ও নলডাঙ্গাসহ প্রায় সব এলাকায় শনিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে নাটোর শহরে বিদ্যুত্ লাইন, টেলিফোন লাইন ও ডিসের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এদিকে, ঝড়ের সময় দৌড়ে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে গুরুদাসপুরের খুবজিপুর ইউনিয়নের পিপলা গ্রামের খোকন (৩৭) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। অপরদিকে, সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা আক্তার জানান, ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে রামানন্দ খাজুরা গ্রামের আব্দুর রহমানের স্ত্রী রাবেয়া বেগম গুরুতর জখম হন। পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এছাড়া ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
 
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর ৬টি উপজেলার উপর দিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় বয়ে যাওয়া ঝড়ে দেয়াল চাপা পড়ে জেলার মান্দা উপজেলায় শাহানাজ বেগম (৩৫) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া জেলায় শিশু, মহিলা, বৃদ্ধসহ অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছে। দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। এ ছাড়াও চলতি ইরি-বোরো ধানসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সারা জেলা বিদ্যুত্ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। শহরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ডসহ অনেক বহুতল ভবনের কাঁচ ভেঙ্গে পড়েছে।
 
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শনিবার সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে ২ জন নিহত ও এক জন নিখোঁজ রয়েছে। নিহতরা হলো কাজিপুর উপজেলার পীরগাছা গ্রামের মোজাম্মল হক (৫৫) ও উল্লাপাড়া উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের আব্দুস সবুরের ছেলে ফজলার রহমান (৪৫)। ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে বিপুল পরিমাণ জমির ফসল নষ্টসহ অসংখ্য গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। শিলাবৃষ্টিতে আমেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড় শুরু হবার সাথে সাথে জেলার বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৬ ঘন্টা পর গভীর রাতে বিদ্যুত্ সংযোগ প্রদান করা হয়।
 
কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, শনিবার রাতে কাজীপুর উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ে বহু ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত, ফসলের ক্ষতিসহ ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ডুবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম মোজাম (৫৫)। তিনি পীরগাছা গ্রামের মৃত গেন্দা আকন্দের পুত্র। নৌকা ডুবে এখনও তিন ব্যক্তি  নিখোঁজ রয়েছেন। ঝড়ে প্রায় তিন শতাধিক ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অসংখ্য গাছপালা, উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ১০টি মসজিদ।
 
রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহীতে কাল বৈশাখী ঝড়ে ৪ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। এছাড়া গাছের ডালপালা ভেঙে বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কাঁচা, সেমি-পাকা বিপুল সংখ্যক বাড়ির টিন উড়ে গেছে। আম, পেঁপে, ভুট্টা, বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে ঘর চাপা পড়ে বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়ায় মৃত নজু মণ্ডলের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৬০) এবং কিশোরপুরে পদ্মা নদীতে নৌকা বাধার সময় মাটি চাপায় মৃত আরশেদ আলীর পুত্র এমাজ উদ্দিন (৪৫) নিহত হয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাধীন রয়েছেন রোকেয়া বেগম (৪৫), শাহানাজ (২৬), হাফিজুল, মাসুদ রানা (৩৭)। পবায় ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ পাতে বড়গাছির সুভিপাড়ার আবুলের পুত্র হাকিম (৩২) এবং গোদাগাড়ী উপজেলার মনোয়ারা বেগম (৬৫) মারা যান।
 
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপর দিয়ে গত শনিবার বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে বিভিন্ন এলাকার ব্যাপক গাছপালা, বাড়িঘর ও টিনের চালার স্থাপনা উড়ে গেছে। প্রচণ্ড ঝড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার নয়ানশুকায় গাছে চাপা পড়ে এক কলেজ ছাত্র মারা গেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঝড়ে ভেঙে পড়েছে বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা।
 
পুঠিয়া (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, রাজশাহীর পুঠিয়ার ভরত মাড়িয়া গ্রামে শনিবার সন্ধ্যার ঝড়-বৃষ্টির সময় দেয়াল চাপায় আদিবাসী বৃদ্ধা ফুলমনি বেশড়া (৭০) ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। এতে আরো ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। এদিকে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে আড়াই হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
 
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরে বজ পাতে সুমন মিয়া (১৫) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এঘটনায় আহত হয়েছে উজাহিদ মিয়া (১৩) ও বদরুল মিয়া (১৪) নামের দুই শিশু। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত সুমন মিয়া উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের উলিপুর-বাগগাঁও গ্রামের কাচা মিয়ার ছেলে। স্থানীয়রা জানায়, রবিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় উলিপুর-বাগগাঁও গ্রামের মাঠে খেলাধুলা করার সময় বজ্রপাতের শিকার হয়ে সুমন মিয়া ঘটনাস্থলেই মারা যায়। 
 
ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ছাতকে বজ পাতে ফয়াজুল মিয়া (৫০) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে জিয়াপুর গ্রামের মাঠে বজ পাতে তার মৃত্যু হয়। তিনি ভাতগাঁও ইউনিয়নের জিয়াপুর-ছয়ঘর গ্রামের মৃত জোনাব আলীর পুত্র। সকালে মাঠ থেকে গরু আনতে গেলে বজ পাতে ঘটনাস্থলেই ফয়াজুল মিয়ার মৃত্যু হয়।
 
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় বজ পাতে হাসান ও রফিক হাজারী নামে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার বিকালে জেলার দেবিদ্বার উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেবিদ্বার উপজেলার ছোট শালঘর গ্রামের ময়নাল হাজারীর পুত্র রফিক হাজারী (৩৫) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ওই উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামে তার শ্বশুর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি ইউসুফপুর (বাজিতপুর) গ্রামের ঈদগাহের পাশে দাঁড়িয়ে একই উপজেলার নবীপুর গ্রামের আবদুল কাদেরের পুত্র হাসানের (২৮) সাথে কথা বলছিলেন। এসময় হঠাত্ ঝড়ো-হাওয়া ও বজ পাতসহ বৃষ্টিপাত শুরু হলে বজ পাতে হাসান ও রফিক হাজারী ঘটনাস্থলে মারা যান।
 
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধার ওপর দিয়ে দুই দফায় গত শনিবার সন্ধ্যা ও গতকাল রবিবার দুপুরে হঠাত্ কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ে শনিবার যমুনা নদীতে নৌকাডুবিতে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। অপরদিকে রবিবার দুপুরে বজ্রপাতে ৬ জন ইট ভাটা শ্রমিক আহত হয়। এছাড়া গাইবান্ধা সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর ও ফুলছড়ি উপজেলায় সহস াধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও অসংখ্য গাছপালা উপড়ে গেছে। ঝড়ে গাছ উপড়ে বৈদ্যুতিক লাইনে পড়ায় শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত গাইবান্ধা শহরে বিদ্যুত্ সরবরাহ ছিল বন্ধ। ঝড়ের সাথে শিলাবৃষ্টির কারণে উঠতি বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নিহত সাহেরা বেগম (৩৫) সাঘাটা উপজেলার নলছিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলামের স্ত্রী।
 
যশোর অফিস জানায়, যশোরে পৃথক তিনটি স্থানে বজ্রপাতে স্কুল ছাত্রসহ দুই জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। রবিবার বিকালে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো যশোরের উপশহর এলাকার এফ ব্লকের শহিদুল ইসলামের ছেলে ৮ম শ্রেণির ছাত্র নুরুজ্জামান (১৫) ও মণিরামপুরের কোমরপুর গ্রামের চানআলীর ছেলে সাগর হোসেন (২৫)।
 
জগন্নাথপুর সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রচণ্ড বেগে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর ছোবলে ৫ শতাধিক  কাঁচা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বিধ্বস্ত  হয়েছে। ঘরের নিচে চাপা পড়ে দরিদ্র পরিবারের ৮০ বছর বয়সের সুরজান বিবি নামের এক বৃদ্ধা মহিলার মৃত্যু হয়েছে।
 
বটিয়াঘাটা (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, গত শনিবার রাতে উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়ের ছোবলে এবং শিলা বৃষ্টিতে রবি শস্য ও বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শতাধিক কাঁচা ঘর এবং ফলবান বৃক্ষ ভেঙে পড়েছে। সংবাদ পেয়ে কৃষি অফিসার রুবায়েত আরা, ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গনি বিশ্বাস, বটিয়াঘাটা প্রেসক্লাব সভাপতি শেখ আব্দুল হামিদ, কোষাধ্যক্ষ রিংটন মণ্ডলসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানগণ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়  পরিদর্শনে যান। ব্যাপক শিলাবৃষ্টির কারণে ৮০ শতাংশ ক্ষেতের তরমুজ নষ্ট হয়ে গেছে। ৬০ শতাংশ বোরা ধান ক্ষতির শিকার হয়েছে। আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফল শিলার আঘাতে ঝরে পড়েছে।
 
শ্রীপুর (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, ৪ এপ্রিল শনিবার উপজেলার মাওনা ইউনিয়নাধীন সিংদীঘি গ্রাম কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। গ্রামের অর্ধশতাধিক ঘড়বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কয়েকটি গবাদি পশু মারা গেছে। ঝড়ের কবলে দু’নারী গুরুতর জখম হয়েছে। মুহূর্তেই বিদ্যুত্হীন হয়ে পড়ে পুরো গ্রাম।
 
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে কালবৈশাখী ঝড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছে। ভেঙে গেছে প্রায় ১০ হাজার বাড়িঘর। আম, শজনেসহ বিভিন্ন ধরনের গাছের ডালপালা ভেঙে রাস্তায় ও বিদ্যুতের তারের ওপর পড়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে যাওয়ায় শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে রবিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিদ্যুত্ সচল করা সম্ভব হয়নি। উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে দেওয়াল চাপা পড়ে আব্দুল খালেক ঘোষের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন (৬৫) ঘটনাস্থলেই মারা যান।
 
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে গত শনিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখীতে সারা জেলায় ৫ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি, শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অসংখ্য গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। শিলা বৃষ্টিতে ইরি-বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। হঠাত্ করে ঘূর্ণিঝড়টি জেলার ৭টি উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যায়। ৭টি উপজেলার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বিপর্যয় ঘটে। ফলে একটানা ১২ ঘন্টা বিদ্যুিবহীন থাকে গোটা এলাকায়। জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইসলামপুর উপজেলা।
 
আত্রাই (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, নওগাঁর আত্রাইয়ে কালবৈশাখী ঝড়ে শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর আঘাতে উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের মির্জাপুর, ভবানীপুর বাজার, মাগুড়াপাড়া, তাড়াটিয়া, শ্রীরামপুর, বিশা ইউনিয়নের তেজনন্দি, শ্রীধরগুড়নই, ইসলামগাঁথী, রাণীনগর, মনিয়ারী ইউনিয়নের কচুয়া, মাড়িয়া, হিঙ্গুলকান্দি, মাছগ্রাম, পতিসর, মস্কিপুর ও হাটকালুপাড়া ইউনিয়নের চকশিমলা, হাঁটুরিয়ার ও বান্দাইখাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত এবং ফসল ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
 
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় শনিবার রাতে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখি ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাত ৮টার দিকে প্রচণ্ডবেগে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর ছোবলে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে বেশকিছু কাচা ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।
 
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি, ফসলের জমি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চরম বিপর্যয় ঘটে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে জেলার মুরাদনগর উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের উপর গাছ উপড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে বিদ্যালয় ও টেবিল-চেয়ারসহ আসবাবপত্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
 
এছাড়া মানিকগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ঝালকাঠি, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামালপুর, মৌলভীবাজার, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতার শনিবারের কালবৈশাখীতে ঘটে যাওয়া ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।