তরুণরাই গড়বে সম্ভাবনার বাংলাদেশ

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা স্বাধীনতার মূল সঞ্জীবনী অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক আদর্শের পুরোপুরি তো নয়ই বরং আংশিকও অর্জন করতে পারিনি। অথচ এ সকল আদর্শের জন্যই ৩০ লাখ মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলো, ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলো। যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো তা আজ অধরাই আছে। বরং দিন দিন সেই আদর্শ থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি। তবে এমন নয় যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ হচ্ছে না। দেশপ্রেমী জনতা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য শ্রম দিচ্ছে। সংখ্যাটা যদিও কম তবে দিন দিন এটি বাড়ছে এবং বাড়ছে এটাই বাস্তবতা।
বর্তমান দৃশ্যপটে বাংলাদেশে যেন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই ভয়াবহ রূপ। প্রতিনিয়ত মানুষ খুন হচ্ছে, দেশের সম্পদ নির্বিচারে নষ্ট হচ্ছে, সবচেয়ে ভয়াবহতা হলো মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। মানুষ কি মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে? তাই আজ বলতে হয় বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু মানুষ বাড়ছে না। রাজনীতির সফলতার পরিবর্তে দেশে এর কুফলতা বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে আজ রক্ত দিয়ে কেনা দেশের জানমাল ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে, এমনকি যে গাছ আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে তাও কেটে ফেলা হচ্ছে। কথায় আছে: “ঘরের শত্রু বিভীষণ”।
১৯৭১ সালে রাস্তাঘাট, গাছপালা কাটা হয়েছিলো শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য আর বর্তমানেও গাছপালা নিধন করা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য, বিরোধীদল সরকারি দলক ঘায়েল করার জন্যই এটি করছে অথচ প্রকৃতপক্ষে ক্ষতি সাধন হচ্ছে দেশেরই। বাংলাদেশ পুরোটাই যেন এখন ফুটবল খেলার মাঠ আর দেশীয় সম্পদ হচ্ছে ফুটবল। যার যেমন ইচ্ছে প্রয়োজনে লাথি মারবে। এমনটা কি আমরা চাই? আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম কী এর জন্য দেশমাতৃকার তরে জীবন দান করেছিলো! দেশ ও দেশের মানুষের সম্পদ নষ্ট করা মানে নিজের অস্তিত্ব্বকে অস্বীকার করা। নিজেই নিজের মৃত্যুর পথের দিকে ধাবিত করা।  
শিক্ষা জাতির সকল শক্তির হাতিয়ার হলেও শিক্ষা আজ পেশাবৃত্তিতে পরিণত হচ্ছে। আমরা এমনই এক অভাগা জাতি যার শিক্ষিত সমাজ আর মিথ্যাচারে লিপ্ত থাকে অথচ দেশকে উন্নত আর সমৃদ্ধ করার জন্য এদেরকেই চালিকাশক্তি হতে হবে অথচ আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে! আমাদের ভবিষ্যত্ কি?  বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের জন্য শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যটাকেও আমরা নানাভাবে বিতর্কিত করে তুলেছি। এখানে আজ রক্ষকই হচ্ছে ভক্ষক। জাতির মেরুদণ্ডকে শক্তভাবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে সর্বোর্ধ্বে রাখতে হবে। এরপর নৈতিকতা আর দেশপ্রেমকে। দেশ গঠনের জন্য মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। এই মানবসম্পদ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে, নৈতিকতা, দেশপ্রেম আর প্রযুক্তিতে বলীয়ান হবে। আর এই মানবসম্পদই হচ্ছে তারুণ্য যারা তাদের জীবন আর যৌবনের উত্তাপ দিয়ে গড়ে তুলবে স্বপ্নের সোনার বাংলা। দেশের সৃষ্টি-কৃষ্টি ও সমগ্র ইতিহাস সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে, স্বাধীনতার চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে যুগ যুগ ধরে তা পালন করে একে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে হবে তবেই স্বপ্নের দেশ গঠন সম্ভব হবে। শিক্ষা, শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে নিরাপদ রাখতে হবে।
রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে সঠিক পথে আনতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “ছাত্র সংসদ” নির্বাচন অত্যাবশ্যক। তবেই দেশ গঠনের স্বপ্নসারথী তৈরি হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন বাংলার ঊর্বর মাটিতে যেমন সোনা ফলে ঠিক তেমনি পরগাছাও জন্মায়। একইভাবেই বাংলাদেশে কতকগুলো  রাজনৈতিক পরগাছা রয়েছে যারা বাংলার মানুষের বর্তমান দুঃখ-দুর্দশার জন্য দায়ী। আমরা বাঙালিরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ জাতি, আত্মীয়তার বন্ধনকেও আমরা রাজনীতি ও ক্ষমতার যাঁতাকালে পিষ্ট করছি। আবেগ সংরক্ষণ করে যুক্তি আর প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে জাতিসত্তাকে আর জাগ্রত করতে হবে তরুণদের উজ্জীবনী শক্তিকে। এজন্য এগিয়ে আসতে হবে প্রবীণদের, সর্বজনস্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের সর্বোপরি সরকারকে। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যকে সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে নিয়ে এবং তাদের জন্যই তৈরি করতে হবে একটি “আদর্শিক মানদণ্ড”। যার লক্ষ্য হবে দেশের সার্বিক উন্নয়ন। আমাদের যে সোনালি অতীত আছে তার দিকে দৃষ্টি দিয়েই তরুণ প্রজন্মকে জাগতে হবে দেশের। বিজয়ের উল্লাসে ও দেশপ্রেমে আমরা মাতোয়ারা হই নির্দিষ্ট কিছুদিনে। বিজয়ের লক্ষ্যবস্তুতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সেটি অনুধাবন করতে হবে, করতে হবে সকলকেই বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে প্রতিটি মুহূর্তে। সর্বোপরি বাংলাদেশ এখন সম্ভাবনাময় একটি দেশ এখনও প্রাণ-প্রাচুর্যের অভাব নেই। শুধু তরুণ প্রজন্মের মুক্তচিন্তার দ্বার খুলে দিতে হবে। দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে ও সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তবেই স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ বাস্তব রূপ লাভ করবে। আমরা তরুণ প্রজন্ম আমাদের প্রাণশক্তির অভাব নেই। আমরাই সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে সুশিক্ষা, যৌক্তিকতা আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত হয়ে দেশপ্রেমে সকলে ঐক্যবদ্ধ থেকে মেধা ও মনন দিয়ে স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবো। 
 
n লেখক: শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা
ই-মেইল: [email protected]/* */