নেতাদের মুখে লাগাম দিতে বললেন মোদী

ভারতের বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর যতটা না প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে সমালোচিত হয়েছে তার চেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে দলের বিভিন্ন নেতার বেফাস মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের জন্য। সর্বশেষ এতে যুক্ত হয়েছে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিমন্ত্রী গিরিরাজ সিংয়ের কটাক্ষ। গিরিরাজ বলেছেন, সোনিয়া গান্ধী যদি নাইজেরিয়ার কোনো নারী হতেন এবং রাজীব গান্ধী যদি তাকে বিয়ে করতেন, তা হলে তিনি কি কংগ্রেস দলের কাছ থেকে এই গুরুত্ব পেতেন? পেতেন না। টিভিতে গিরিরাজের এই বর্ণ বৈষম্যমূলক বক্তব্য সম্প্রচারের পর গোটা দেশে সমালোচনা শুরু হয়। এমনকি এই বক্তব্যে কড়া আপত্তি জানিয়েছে নাইজেরিয়াও। নাইজেরিয়া মনে করছে ভারতের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেনিয়ানদের গায়ের রঙ নিয়ে তামাসা করল। অর্থাত্ ভারত সরকার সাদা-কালোর বিভাজনে বিশ্বাস করে!
 
গিরিরাজের এমন মন্তব্য নতুন নয়। লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, ভোটের পর মোদী-বিরোধীদের ঠাঁই হবে পাকিস্তানে। তার পরের বিতর্কিত মন্তব্য সন্ত্রাসবাদীরা সব একই সম্প্রদায়ভুক্ত কেন? এবারে আরো এক ধাপ এগিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন তিনি। সোনিয়া গান্ধীর গায়ের রঙ নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এমন মন্তব্যে বিতর্কের ঝড় ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
 
এ মন্তব্যের কারণে সাংবাদিক সম্মেলন করে কংগ্রেস গিরিরাজের ইস্তফার দাবির সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছেও ব্যাখ্যা চেয়েছে। প্রতিবাদ জানিয়েছেন, নীতীশ কুমার, লালু প্রসাদ, বৃন্দা কারাটের মতো নেতারা। দেশে-বিদেশে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ায় সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছেন বিজেপি সভাপতি খোদ অমিত শাহ। অমিত শাহ ভবিষ্যতে তাকে সতর্ক হয়ে মন্তব্য করার পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি হালকা আলাপচারিতার সময়েও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার দলের নেতা ও মন্ত্রীদের মুখে লাগাম দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আর কেউ যেন বেফাস মন্তব্য করে সরকারকে বিপাকে না ফেলেন। যদিও গিরিরাজ তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
 
তবে গিরিরাজের বক্তব্যে একটুও বিচলিত নন কংগ্রেস সভানেত্রী। সোনিয়া বলেন, এ রকম নিচু মানসিকতার এক ব্যক্তির কথার কোনো জবাব আমি দিতে চাই না। সোনিয়া শুধু এই মন্তব্য করে বিষয়টি থেকে দূরত্ব বজায় রাখলেও বিক্ষোভ-প্রতিবাদ করেছে কংগ্রেস। গত বৃহস্পতিবারও দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং পটনার মতো বিভিন্ন জায়গায় গিরিরাজকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে প্রতিবাদ করেছেন তারা।
 
গিরিরাজের মন্তব্যের কারণে শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয় বিভিন্ন অঙ্গন থেকেও প্রতিবাদ চলছে। অনেকেই বলছেন, গিরিরাজের বন্ধু থাকলে নরেন্দ্র মোদীর আর গোঁড়ামি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না! টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক নিবন্ধে বলা হয়, গিরিরাজের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তার বর্ণ বৈষম্যের গোঁড়ামি প্রকাশ পেয়েছে। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘অফ দ্য রেকর্ড’ এ মানুষ যেকোনো কিছুই বলতে পারে। এটা গেলো একটি দিক। এ মন্তব্যের আরেকটি দিকও আছে। এনডিটিভির এক নিবন্ধে বলা হয়, সোনিয়াকে নিয়ে গিরিরাজের এ মন্তব্যের কারণে নাইজেরিয়া ও সমগ্র আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ রাজনীতিতে বর্ণবাদ ও নারী বিদ্বেষিতার কোনো স্থান নেই। এমন কি তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গিরিরাজ তার মন্তব্যের পর সোনিয়া গান্ধীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তিনি নাইজেরিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছেন।
 
এ বছরের শেষদিকে নয়াদিল্লি ইন্ডিয়া-আফ্রিকা সামিটের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এটা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বড় একটি পদক্ষেপ। এ সম্মেলনে ৫৪টি আফ্রিকান দেশের সকল নেতাকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সে অবস্থায় এ ধরনের মন্তব্য কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এছাড়া মন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য আফ্রিকায় অবস্থানরত ভারতীয়দের জন্যও বিব্রতকর। এই বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবশ্যই ভারতের সুশীল সমাজকে নামতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে যে একটি বড় দেশকে নিয়ে উপহাসকারী মন্ত্রীকে আর রাখা ঠিক হবে কিনা?