যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা এবার শুরুই হয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়ে। ব্রিটিশ রীতি অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে রাণী এলিজাবেথকে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। এবারও সেই পুরনো রীতি পালন করেছেন ডেভিড ক্যামেরন। তবে তা শেষবারের জন্য। এরপর আর কোন প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে রানীর শরণাপন্ন হতে হবে না। নতুন আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষের নির্ধারিত দিনে পার্লামেন্ট নিজে থেকেই ভেঙে যাবে। ঐ দিন থেকেই যথারীতি নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন প্রার্থীরা। এজন্যে কোন নিয়ম মানতে হবে না কাউকে। আর এ কারণেই ব্রিটিশ গণতন্ত্রের ইতিহাসে শেষবারের এই ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বর্ণিত থাকবে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং রানী এলিজাবেথের নাম।
দুনিয়ার সবচেয়ে পুরনো গণতান্ত্রিক দেশ যুক্তরাজ্য। সেদেশের পার্লামেন্ট হাউস অব কমন্সের নির্বাচন আগামী ৭ মে। এখন থেকে ঠিক এক মাস বাকি। শুরু হয়ে গেছে কাউন্টডাউন। এরই মধ্যে যার যার সামর্থ্য নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনে এবার অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতিহাসের গতানুগতিক ধারা ভেঙে বড় দুই দলকে টেক্কা দিয়ে নতুন কারো আবির্ভাব ঘটতে পারে। গত ২ এপ্রিল নেতাদের জমজমাট টিভি বিতর্ক দেখে মনে হয়েছে, সেই ভবিষ্যদ্বাণীই যেন ফলতে শুরু করেছে। ঐ বিতর্কে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ডকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতারা।
কনজারভেটিভ পার্টি মধ্য ডানপন্থি এবং লেবার পার্টি মধ্য বামপন্থি বলে পরিচিত। এ দুই দলের পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসার প্রায় শত বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। তবে গত নির্বাচনে নিজের শক্তিমত্তা দেখিয়েছে আরেক লিবারেল ডেমোক্র্যাট দল। দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের চাহিদার প্রতি নজর রাখতে সক্ষম হয়েছে এই দলটি। ১৮৩৪ সালে টোরি পার্টি ভেঙে জন্ম নিয়েছিলো কনজারভেটিভ পার্টি। ঐতিহ্যগতভাবেই এই দলের অবস্থান অবাধ বাণিজ্য, বেসরকারি শিল্পোদ্যোগ, ব্যক্তি স্বাধীনতা, স্বল্প কর ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ার পক্ষে। এবারের নির্বাচনে রক্ষণশীল এই দলের প্রধান প্রতিশ্রুতি অর্থনৈতিক ঘাটতি না রাখা, কর কমানো, বাড়ির মালিকানা পেতে সহায়তা দেয়া, অবসরকালে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেয়া, শিশুদের উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ ইস্যুতে ২০১৭ সালের মধ্যে গণভোটের আয়োজন এবং অভিবাসীদের জন্য শক্ত আইন করা। এসব লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হতে চান কনজারভেটিভ দলের নেতা ডেভিড ক্যামেরন।
ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিলো লেবার পার্টি। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করাই এই দলের ধর্ম। বামপন্থি দল হিসাবে সম্পদের পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা লেবার পার্টির প্রধান লক্ষ্য। ২০১০ সাল থেকে লেবার পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এড মিলিব্যান্ড। দলের মেন্যুফেস্ট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ঋণ না নেয়া, অর্থনৈতিক ঘাটতি কমানো, আবাসন খাতে আড়াই বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি তিন হাজার পাউন্ডে কমিয়ে আনা এবং ২০১৭ পর্যন্ত বিদ্যুত্ বিল ফ্রিজ করা লেবার পার্টির প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। এমনকি অভিবাসীদের কাজে লাগানোর মাধ্যমে দেশীয় শ্রমিকের পারিশ্রমিক কমানোর প্রক্রিয়াকেও অবৈধ ঘোষণা করতে চায় লেবার পার্টি।
সদ্য উঠতি লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের জন্ম ১৯৮৮ সালে। ব্রিটেনের অন্যতম পুরনো লিবারেল পার্টি এবং লেবার পার্টির শাখা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টি একীভূত হয়ে জন্ম নেয় লিবারেল ডেমোক্র্যাট দল। ২০০৭ সাল থেকে এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিক ক্লেগ। লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হলো-দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের কর কমিয়ে এবং উচ্চবিত্তদের কর বাড়িয়ে বাজেটে ভারসাম্য তৈরি, নার্সারি থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত ও প্রতি ক্লাসের যোগ্য শিক্ষকের জন্য শিক্ষা তহবিলের নিশ্চয়তা, জনগণের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমতা বিধান, প্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নতুন পাঁচটি আইন প্রণয়ন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে থেকে নতুন নতুন ব্যবসায়িক বাজার খুঁজে বের করা, ইইউ সদস্যপদ ইস্যুতে প্রয়োজন বোধে গণভোটের আয়োজন, সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে কাজ করা ইত্যাদি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৩ সালে জন্ম নেয় ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টি। সংক্ষেপে ইউকেআইপি। অভিবাসী কমানোও এই দলের অন্যতম মূল লক্ষ্য। এছাড়াও প্রচারণার মাঠে নেমেছেন গ্রিন, রেসপেক্ট, ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট, এসএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার দিন ৩০ মার্চ থেকেই সরগরম যুক্তরাজ্যের নির্বাচনী মাঠ। হাউস অব কমন্সের ৬৫০টি আসন বা নির্বাচনী এলাকায় এসব দলের এমপি প্রার্থীরা চালিয়ে যাচ্ছেন জোর প্রচারণা। আগামী ৭ মে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে একজন করে এমপি নির্বাচিত করবেন। সবচেয়ে বেশি আসনে বিজয়ী প্রার্থীদের দলই সরকার গঠন করবে। যা জানা যাবে ভোটের পরদিন, ৮ মে।