আর্থিক খাত সংস্কারের তাগিদ

ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, পুঁজিবাজারে সংস্কারসহ বিনিয়োগ বাড়াতে আর্থিক খাতের সংস্কারের তাগিদ দিলেন অর্থনীতিবিদরা। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে আগামী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নকে সামনে রেখে ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে এ আলোচনার আয়োজন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। এতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (পিআরআই), ‘ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ’ (ইআরজি), ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ (বিআইডিএস) ও ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা পুঁজিবাজার সংস্কার, ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন সুপারিশ করেন। সেই সাথে রপ্তানি প্রণোদনাগুলো অগ্রাধিকার সব খাতে  বণ্টন করা, বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরো দ্রুত করাসহ ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের বাধা অপসারণ করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তারা। এসময় অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি আশা করছি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের মতোই হবে। বিগত হরতাল-অবরোধে যে ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করেছিলাম সেটি হয়নি। অনেকেই এ ক্ষয়-ক্ষতির হিসেব করছেন কিন্তু এর পরিমাণ খুব বেশি নয়।
পিআরআই’র নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের ৬১টি পরিবারকে দেয়া ব্যাংক থেকে ঋণ দেয়া হয়েছে ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এটি উদ্বেগজনক। আমাদের ব্যংকিং খাত আরো শক্তিশালী করতে হবে। দেশে বিদেশি ব্যাংকের অর্থ প্রবেশের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশি ব্যাংকে সুদ হার মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। কিন্তু এদেশের ব্যাংকের মালিকরা ১৭-১৮ শতাংশ সুদ নিচ্ছেন। তারা একরকম ঝুঁকিহীন ব্যবসা করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ বাড়াচ্ছে কিন্তু তাতে আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা কতটা কমছে তা দেখতে হবে।
বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, যেহেতু এবছরই সহস্রাব্দ লক্ষ্য অর্জনের (এমডিজি) সময় শেষ হচ্ছে তাই আগামী বাজেট প্রতিবেদনে এর অগ্রগতি সংক্রান্ত তথ্য থাকা প্রয়োজন। তিনি সোনালী ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে অন্য ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানান। 
অর্থনীতিবিদ জায়েদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন আশাব্যঞ্জক। কিন্তু আমাদের এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, গড়ে ১৫ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। বাণিজ্য নীতিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গত কয়েক মাসে হরতাল, অবরোধ, জঙ্গিবাদের ফলে ক্ষতি হউক বা না হউক, সকলেই চাইবে যেনো তাদের  ‘বেইল আউট’ বা বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। বাজেটে এ বিষয়টি সঠিকভাবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, দেশের ৪ শতাংশ ঋণ গ্রহীতার কাছে দেয়া হয়েছে মোট ঋণের ৯০ শতাংশ অর্থ, এটি ঝুঁকিপূর্ণ। বড় ঋণ গ্রহীতাদের বেশি সুবিধা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আর্থিক খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরো শক্তিশালী করার তাগিদ দেন।
অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দীন বলেন, আমাদের বিনিয়োগ বোর্ডকে ঢেলে সাজাতে হবে। সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) গতিশীলতা আনতে হবে। যে সমস্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা রয়েছে তাদেরও নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির নিকট সরকারের অনেক পাওনা রয়েছে কিন্তু তারা তা পরিশোধ করছে না। এর জবাবে অর্থমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান যারা বেআইনিভাবে টাকা ধরে রেখেছে সেটি বন্ধ করতে হবে। তাদের জেল দিতে হবে।
বিআইডিএস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক নাজনীন সুলতানা বলেন, সরকার রপ্তানি খাতে যে প্রণোদনা দেয় তার ৫৫ শতাংশ নিয়ে যায় তৈরি পোশাক খাত। কিন্তু রপ্তানি নীতিতে অগ্রাধিকার আরো খাত রয়েছে যারা প্রণোদনা পায় না। তৈরি পোশাক খাতে ভর্তুকি কমিয়ে অন্য খাতে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। সেইসাথে ইন্টারনেট ব্যবহার খরচ কমাতে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।