ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই উনি ঘরে ফিরেছেন :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত নাকি তিনি ঘরে ফিরে যাবেন না! ভেবেছিলেন দলীয় কার্যালয়ে নিজেকে স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ রেখে মানুষকে পুড়িয়ে মারার হুকুম দিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়ে বিজয়ের মালা নিয়ে ঘরে ফিরবেন। কিন্তু তার সেই খায়েশ পূরণ হয়নি, বরং সম্পূর্ণ পরাজিত হয়েছেন উনি। বিএনপি নেত্রীকে পরাজিত হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়েই বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে। এ বিজয় আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের। এ বিজয়কে ধরে রাখতে হবে। তিনি যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলের নেতাকর্মীদের সদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণভবনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ড-ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে দল সমর্থিত একক মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর বিজয়ের ব্যাপারে
নগরের নেতারা বিভিন্ন পরামর্শ তুলে ধরেন। বৈঠকে দল সমর্থিত একক প্রার্থীর পক্ষেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, ৯২ দিন পর বিএনপি নেত্রী ‘গুহা’ থেকে বের হয়েছেন। সরকার উত্খাতের জন্য উনি অভিনব কৌশল নিয়ে নিজের কার্যালয়ে নিজেকে বন্দী করে রেখেছিলেন। এই ৯২ দিন ধরে মানুষ হত্যা করা আর দগ্ধ হয়ে নিহত ও আহতদের ভয়াল যন্ত্রণা, কষ্টই বিএনপি নেত্রীর একমাত্র সফলতা। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী দিয়ে বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে যে জনগণের মতামত পরিবর্তন করা যায় না, তা আবারো প্রমাণিত হয়েছে। যেকোন ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বিরুদ্ধে দেশের জনগণেরই প্রতিবার বিজয় হয়েছে। দেশের জনগণই হচ্ছে প্রধান শক্তি। মানবতাবিরোধী, সন্ত্রাসী, নাশকতাকারী ও জঙ্গিবাদীরা কখনো জয়ী হতে পারে না।  এবারও হতে পারেনি। ভবিষ্যতেও কেউ যাতে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সেজন্য সকলকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
দলের প্রতিটি নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, যেকোন সময় কালবৈশাখী ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতি আসতে পারে। তা মোকাবেলার জন্য সবাইকে প্রস্তুত ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিএনপি-জামায়াতের ডাকা ৯২ দিন হরতাল-অবরোধের সময় জনগণের পাশে থেকে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় অক্লান্ত পরিশ্রম করায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, দেশবাসী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।  শেখ হাসিনা বলেন, অতীতেও নানা সময় দেশ ও আমাদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু আমরা সততা ও দক্ষতার সাথে দেশ পরিচালনা করছি এবং দেশের উন্নয়ন করে যাচ্ছি বলেই সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেছে। দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের এই অগ্রযাত্রা কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সৃষ্টি করি, আর বিএনপি-জামায়াত জোট ধ্বংস করে। ধ্বংস করা আর হাওয়া ভবন খুলে লুটে খাওয়াই হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি। একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের উন্নতি হয়, দেশের মানুষ ভালো থাকে। বিএনপির আমলে বাংলাদেশ পরিচিত পায় সন্ত্রাস-জঙ্গি ও দুর্নীতির দেশ হিসেবে। আর আওয়ামী লীগ আমলে এখন সারাবিশ্বের কাছেই বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনীতিকের কাজই হচ্ছে জনগণের স্বার্থে কাজ করা, জনগণের মঙ্গল করা। অতীতেও আমরা বহু আন্দোলন করেছি, সেই আন্দোলন করেছি দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে। আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীরাই নিহত হয়। কিন্তু রাজনীতির কথা বলে দেশের জনগণকেই পুড়িয়ে হত্যা অতীতে কোনদিন আমরা দেখিনি। যা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ৯২ দিন ধরে করে গেছেন। এমনকি নিজের ছেলের মৃত্যুর পর দেশে লাশ আসার সময়ও উনি হরতাল-অবরোধ অব্যাহত রাখেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সকল অবরোধ-হরতাল দেশের জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের ৯২ দিনের হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি কলের গানের ভাঙ্গা রেকর্ডের মতোই শুধু ছিল, বাস্তবে তার কোন প্রভাব ছিল না। বিএনপি নেত্রীর ধ্বংসাত্মক সহিংস কর্মসূচিকে দেশের জনগণ ন্যূনতম সমর্থন জানায়নি।
ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী তৃণমূল নেতাদের ভূমিকার প্রশংসার পাশাপাশি দলের কিছু সিনিয়র নেতার প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, অন্যায়ের কাছে আমি কখনো মাথা নত করিনি। ওয়ান ইলেভেনের সময় আমি প্রতিবাদ করেছিলাম বলেই আমাকে গ্রেফতার করে বন্দী রাখা হয়েছিল। কিছু সময় উঁচু (সংস্কারপন্থী সিনিয়র নেতা) নেতাদের মাথা এতোই উঁচুতে চলে যায় যে তারা টালমাটাল হয়ে পড়েন। কিন্তু তৃণমূল নেতারা কখনো ভুল করে না। নীতি-আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে তৃণমূল নেতারা সোচ্চার হয়েছিল বলেই ওই সময়ে সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে তাঁর মুক্তির জন্য ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে মাত্র ১৫ দিনে নগরীর ২৫ লাখ মানুষের স্বাক্ষর গ্রহণের দৃষ্টান্তের ভুয়সী প্রশংসাও করেন শেখ হাসিনা।
সংগঠনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, জনগণের কাছে যেতে হবে, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হতে হবে। ঢাকা মহানগরীর উন্নয়নের চিত্র নগরবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির আমলে রাজধানীর হাল কি ছিল, এখন কেমন হয়েছে একটু বিচার করুন। আমরা নগরবাসীর বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাসের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম হয়েছি। রাজধানী ঢাকাকে এমনভাবে সাজিয়েছি, যাতে বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর সঙ্গে এখন ঢাকাকে তুলনা করা যায়। উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। কেউ তা রুখতে পারবে না।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মূল মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজ, সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ।

এছাড়া মতবিনিময় সভায় ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন পরিচালনায় আওয়ামী লীগের প্রধান সমন্বয়ক যথাক্রমে ড. আবদুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান ছাড়াও দক্ষিণের দল সমর্থিত একক মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকন, দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক আবদুল মান্নান খান, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ সেলিম এমপি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সুজিত রায় নন্দী, একেএম এনামুল হক শামিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।