বেনোতে বুঁদ সবাই

 
মৃত্যুর পরে প্রায় ৪৮ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও রিচি বেনোকে নিয়েই আলোচনা চলছে ক্রিকেট বিশ্বে। থেমে যাওয়া এই ক্রিকেট কণ্ঠকে নিয়ে বিশেষ ক্রোড়পত্রসহ তার কর্মচঞ্চল জীবনের নানা কীর্তি শ্রদ্ধা আর বিনয়ের অক্ষরে ছেপেছে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম। বাদ পরেনি ক্রিকেট খেলুড়ে অন্যান্য দেশের দৈনিকগুলোও। পাশাপাশি খেলাটির সাবেক-বর্তমান কিংবদন্তিরা সামাজিক মাধ্যমে নানা বার্তা আর স্মৃতিচারণায় স্মরণ করে চলেছেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিটিকে।
 
ত্বকের ক্যান্সার এবং মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা পরবর্তী নানা সমস্যার সাথে পাল্লা দিতে না পেরে গত শুক্রবার ঘুমের মধ্যেই মৃত্যুকে বরণ করে নেন বেনো। ধারাভাষ্যকার হিসাবে প্রায় ৫০০ টেস্ট ম্যাচে উপস্থিত থাকা বেনোর ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে ক্রিকেটের প্রতি তার নিরন্তর আবেগ আর সীমাহীন ভালবাসার কথা।
 
শব্দের সীমিত ব্যবহার আর ভাষাগত মাধুর্যে টেলিভিশন ধারাভাষ্যকে নতুন রূপ দেয়া বেনোর ক্রিকেটের প্রতি অবদানকে স্বশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছেন সবাই। আধুনিক ক্রিকেটের আদি বিজ্ঞাপন বলে মনে করা হয় যে ওয়ার্ল্ড সিরিজকে, সেই টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক হিসাবে বেনোর অবদানকেও স্মরণ করা হয়।
 
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক সিডনি মর্নিং হেরাল্ড আয়োজন করে ১২ পৃষ্ঠার একটি বিশেষ ক্রোড়পত্রের। অন্যদিকে সিডনির আরেক বিখ্যাত দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রথম পাতার শিরোনাম ছিল ‘এ মার্ভেলাস ইনিংস’। ভেতরে প্রধান সংবাদ অংশে আরো পাঁচ পাতা এবং খেলাধুলা অংশে আলাদা করে বেনোকে নিয়ে লেখা নানা গল্প প্রকাশ করে তারা।
 
মেলবোর্নের দ্য এজ সংবাদপত্রে বেনোর কর্মময় জীবন নিয়ে শোক সংবাদ লেখেন গ্রেগ বাম। শিরোনাম ছিল, ‘ক্রিকেটার বেনো ছিলেন ধারাভাষ্যকার বেনোর মতোই, সবার চেয়ে একটু আলাদা কিন্তু সবার উপরে।’
 
বাম লেখেন,‘ বেনোর ক্রিকেট ধারাভাষ্য নিজেই ছিল নিজের বিজ্ঞাপন। (শুনে) মনে হয় সেখানে আরেকটু কিছু যোগ করা যায়। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, এই সংক্ষিপ্ততাই আসলে খুব প্রয়োজন। অনেকটা গুনগানের মতো কিন্তু তোষামোদের কাছ থেকে অনেক দূরে।’
 
আরেক বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান লেখক-সাংবাদিক ম্যালকম নক্স সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে তার প্রতিবেদনে মূলত আলোকপাত করেন বেনোর ক্রিকেটীয় জীবনে। ৬৩ টেস্টের ক্যারিয়ারে ২৮ টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বেনো। ১৯৫৮ সালে নেতৃত্বের বাহুবন্ধনী পরার পর সেটা খুলেছেন ১৯৬৪ তে ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সময়। তার সময়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারতে হয়নি একটি সিরিজও। নক্স তার প্রতিবেদনে লেখেন, ‘ক্রিকেটার বেনো ছিলেন যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীনতার প্রতীক। বুক খোলা শার্ট আর আবেগপূর্ণ উদযাপনে সবসময়ই সেটাই প্রকাশ পেত। ১৯৪৮ সালে যখন তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন আর ১৯৬৪ যখন শেষবারের মতো খেলেন, পুরোটা সময়ই ছিল এমন।’
 
ক্রিকেট পাগল বেনোর চেয়ে ভাল মানের ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খুব বেশি জন্মায়নি জানিয়ে তিনি আরো লেখেন, ‘ক্রিকেটার হিসাবে অস্ট্রেলিয়া বেনোর চেয়ে ভাল খুব বেশি কাউকে পায়নি।’
 
আরেক বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান দৈনিক দ্য অস্ট্রেলিয়ান এ লেখক গিডিয়ন হেই বেনোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘ধারাভাষ্যকার বেনো খুব কম সময়ই নিজের ক্রিকেটীয় জীবনের স্মৃতিচারণা করেছেন। ফলে ধারাভাষ্য কক্ষে তার উপস্থিতি হয়ে পড়েছিল অনেকটা সময় নিরপেক্ষ। টেলিভিশনের পর্দায় এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, তার বয়স হয়তো থেমে গেছে। তবে মনে রাখতেই হবে খেলাটির সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনারদের একজন বেনো। অধিনায়ক হিসাবেও তেমনি।’
 
অস্ট্রেলিয়ার রেডিও ধারাভাষ্যকার জিম ম্যাক্সওয়েল লিখেছেন দারুণ একটা বাক্য, ‘যদি ক্রিকেট কখনো একজন পোট নির্বাচন করতো তবে তিনি হতেন রিচি বেনো। গত ৫০ বছরে তার মতো এতটা সম্মান আর কেউ পায়নি। তার মতো প্রভাবও কেউ বিস্তার করতে পারেনি।’ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট তার মৃত্যুকে বলেছেন ‘অস্ট্রেলিয়ার জন্য দুঃখের দিন’ হিসাবে।