নির্দলীয় নির্বাচনে দলীয় আমেজ

নির্দলীয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে রাজনৈতিক রূপ দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এবং জোট পৃথক দুটি প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দলীয় ভিত্তিতে প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচারণাসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। শুধুমাত্র মেয়র পদেই নয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী আসনেও প্রার্থিতা ঘোষণা করছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যারা প্রার্থী হবেন তাদের দল থেকে বহিষ্কার এবং পদ-পদবী থেকে বাদ দেয়ার হুমকিও দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে কমিশনার প্রার্থীদের কাছ থেকে ভয়, হুমকি এবং প্রলোভন দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার পত্রে স্বাক্ষর করে নেয়া হয়েছে।

 

রাজনৈতিক দলগুলোর এ ধরনের আচরণের ফলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। দ্বি-দলীয় প্রভাব এবং তাদের দলভিত্তিক নির্বাচনী প্রচার ও কর্মকাণ্ডের ফলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। সিটি নির্বাচনের পরিস্থিতি ধীরে-ধীরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মত রূপ লাভ করছে। এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়ন সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং যে সকল রাজনৈতিক দল এসব কর্মকাণ্ড করবে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা না গেলে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা যাবে না।

 
সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে যে সকল আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার একটি চেষ্টা ছিলো। যেমন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা দলীয় ভিত্তিতে মনোনয়ন ও প্রতীক বরাদ্দ পান। প্রার্থীরা তাদের প্রচার কার্যক্রমে দলীয় পরিচয় এবং নেতা-নেত্রীদের ছবি ব্যবহারেরও সুযোগ পেয়ে থাকেন। কিন্তু ২০১০ সালে প্রণীত সিটি করপোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালার ২(ঙ) ধারায় বলা আছে, “নির্বাচনী প্রচারণায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ব্যতীত কোন রাজনৈতিক দলের নাম বা প্রতীক বা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম বা ছবি ছাপাইতে বা ব্যবহার করিতে পারিবে না।” সিটি নির্বাচন যে একটি নির্দলীয় নির্বাচন এই বিধান থেকেই তা স্পষ্ট।
 
এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের এখানে যে ব্যবস্থা আছে তা একটি নির্দলীয় নির্বাচনেরই ব্যবস্থা। কিন্তু তার আইনি কাঠামোগুলো যথেষ্ট নয়। আর যেটুকু আইন আছে তার ব্যবহারও নির্বাচন কমিশন করতে পারছে না।
 
এদিকে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিটি নির্বাচনকে দলীয় ভিত্তিতে করার প্রস্তাব দেন। এ প্রসঙ্গে সাবেক সিইসি বলেন, ভারতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে হয়। নীতি নির্ধারকরা যদি দলীয় ভিত্তিতে চান তাহলে সে রকম আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, আইন প্রণয়নকারীরা যদি মনে করেন দেশের সব নির্বাচনই দলীয় ভিত্তিতে করবেন তাহলে সেভাবে তারা আইন প্রণয়ন করুন। কিন্তু এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে দয়া করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় রূপ দিবেন না। তিনি বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ আছে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য কোন কোন প্রার্থীকে চাপ দেয়া হচ্ছে। যা সুস্পষ্টভাবে নির্বাচনী আচরণবিধির লংঘন।

 

আগামী ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরেই রাজনৈতিক দলগুলো সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৈঠক শুরু হয়ে যায় কিভাবে নিজ দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করা যায়। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও তারা কৌশলের আশ্রয় নেন। সরাসরি মনোনয়ন না দিয়ে তারা সমর্থন ঘোষণা দিচ্ছে। সাংবাদিক ও আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন ও সমিতি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নির্বাচনগুলোতে যেভাবে নীল-সাদা প্যানেল দেয়া হয় তেমনিভাবে তারা বিভিন্ন ফোরাম থেকে দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে। এ কাজে প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোট তাদের অনুগত এবং সমমনা পেশাজীবী এবং বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে পৃথক দুটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। ‘সহস্র নাগরিক কমিটি’ নামে ঢাকায় এবং ‘নাগরিক কমিটি’ নামে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি ফোরাম তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’ এবং ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলন’ এর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।

 

প্রার্থী বাছাই এবং মনোনয়ন মূলত ওই দুটি প্রধান দলের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে এসেছে। নির্বাচনী ব্যয় কর্মকৌশল থেকে সব কিছুই দল দুটির কেন্দ্রীয় নেতারা দেখভাল করছেন। কিন্তু ‘নির্দলীয় দেখাতে’ ব্যবহার করা হচ্ছে ওইসব প্লাটফর্মের সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের। দেশে যেমন দীর্ঘদিন ধরে দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তেমনি বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে একই অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই দুটি ধারার প্রভাবের কারণে সিটি নির্বাচনের মত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলের সদস্যরা।