ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে সারা বিশ্বে এখন আলোচনা তুঙ্গে। চুক্তিটি কেবল সমঝোতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ এই ইস্যুতে আলোচনায় যেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ঘাম ঝরাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বাগিবতণ্ডায় লিপ্ত আছে প্রধান দুই রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দেশ দুটির সরকার একদিকে দেশের ভেতরের জনগণ তথা বিরোধী দলের চাপ মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে বাইরের চাপ তো আছেই। তবে যতটা না জনগণ তার চেয়ে বেশি চাপ বিরোধী দলের। উভয় দেশের সরকারই কট্টরপন্থীদের সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। আর কৌশলে এর জবাবও দেয়া হচ্ছে। একই বিষয় ইরান তার বিরোধীদের এবং জনগণকে একভাবে এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তার দেশের বিরোধী রিপাবলিকান দলসহ নিজ দলের কংগ্রেসম্যানদের বাগে আনতে ভিন্ন উত্তর দিচ্ছেন। কীভাবে সেসব প্রশ্নের সামাল দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী ভায়েজ। এই চুক্তি ভেস্তে গেলে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তাদের ভাবমূর্তি কেমন হবে বিষয়টি উভয় দেশই জানে।
মার্কিন সরকার বলছে, আমাদের বিচার করতে হবে সার্বিকভাবে ইরানের ওপর এই চুক্তির প্রভাব কেমন হবে। এই চুক্তির কারণে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে এবং পরমাণু বোমার সক্ষমতা হারাবে। আমরা নাটকীয়ভাবে ইরানের সেন্ট্রিফিউজ কমাতে সক্ষম হয়েছি। আমরা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ৫ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছি। এর মাধ্যমে দেশটির সামরিক বাহিনীও পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। কেউ যদি মনে করেন যে, ইরানের সব পরমাণু কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার চুক্তি হোক। তাহলে সেই ভাবনাটা হবে অবাস্তব। আমরা যে দশ বছরের জন্য সেন্ট্রিফিউজ কমাতে সক্ষম হয়েছি সেটাই বড় বিষয়।
অপরদিকে, ইরান সরকার বলছে, আমাদের সমঝোতার কৌশল ঠিক করা হয়েছে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, মর্যাদা, অভিজ্ঞান এবং নিজের স্বার্থ ও সুবিধার ওপর ভিত্তি করে। এই কৌশল পশ্চিমা বিশ্বের দাবি পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তারা চেয়েছিল আমাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ বাতিল করতে যা সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ। তারা বেশি হলে ৫০০ বা ১৫০০ সেন্ট্রিফিউজ পর্যন্ত সুযোগ দিতে চেয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা মনে করে, আমাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রতীকী নয়। তারা এই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন এবং আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা চলমান রাখতে সহায়তা দেবে। এই চুক্তিতে একটি বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বাণিজ্যিকভাবে আমরা আমাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে চালাতে পারব যার জন্য আমরা বহু বছর ধরে লড়াই করে আসছি।
বিনিময়ে আমরা কিছু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সীমাবদ্ধতা গ্রহণ করেছি। কিন্তু বাস্তবে আমাদের এখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য সীমিত কিছু নির্দেশনা প্রয়োজন। আমাদের বুশেইর পরমাণু কেন্দ্র রাশিয়ার সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। আমরা রাশিয়ার সঙ্গে ২০২১ সাল পর্যন্ত একটি চুক্তি করেছি যার মাধ্যমে রাশিয়া আমাদের পরমাণু সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। সুতরাং সত্যি কথা বলতে কি এখন আমাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
তেহরানের রিঅ্যাক্টর পরিচালনার জন্য আমাদের ২০ শতাংশ জ্বালানি আছে যা আমরা বহু বছর ব্যবহার করতে পারব। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ভবিষ্যতের জন্য আরো জ্বালানি সরবরাহের অঙ্গীকার করেছে। কারণ শতকরা ২০ ভাগ সমৃদ্ধকরণ অর্থনৈতিকভাবে অপর্যাপ্ত। তাই আমরা যে চুক্তি করেছি সেটা অত্যন্ত সুবিধাজনক আমাদের জন্য। আমরা চূড়ান্ত চুক্তি করতে সময় পাব। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তার মিত্ররা যদি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে এবং সহযোগিতা না করে তাহলে আমরা জ্বালানি উত্পাদন বাড়ানোর জন্য সময় পাচ্ছি।
এছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত এক্ষেত্রে। ইরানের পরমাণু জ্বালানি সংস্থার পরিচালক জানিয়েছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি যদি কোনো চুক্তি ছাড়াই চলতে থাকে তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য যে ধরনের পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন তার সুযোগ হারাব। আমাদের গবেষণা এবং উন্নয়ন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আমাদের গবেষণাকে কেউ সীমিত করতে পারবে না। কারণ আমাদের বিজ্ঞানীরা এবং ছাত্ররাই আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করবে। আমরা আমাদের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি সমৃদ্ধকরণে সামান্য কিছু সীমাবদ্ধতা গ্রহণ করেছি। বাস্তবে এটা আমাদের এই সীমাবদ্ধতা আমাদের কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। আমরা হয়তো এখন শক্তিশালী সেন্ট্রিফিউজের উন্নতি ঘটাতে পারব না। আমরা এখন পরমাণু জ্বালানি চক্রের দিকে নজর দিচ্ছি। যে কোনোভাবে হোক সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে এই কর্মসূচি আমাদের জন্য দরকার। দশ বছরে আমরা গবেষণা এবং উন্নয়নের কাজ করতে পারব। আমরা আরো বেশি শক্তিশালী হব।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন বলছে, আমরা সবসময়ই চুক্তি করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি সময় চেয়েছি যাতে ইরান তার অঙ্গীকার লঙ্ঘন করে এবং একটি পরমাণু বোমা তৈরি করে। এতে করে আমরা তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারব। আইএইএ সঠিকভাবে তাদের পরমাণু কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারব। তারপর ইরান যে পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে চালাচ্ছে সেই বিষয়টিও নিশ্চিত হতে পারব। চুক্তির জন্য সময় দরকার। কিছু পদক্ষেপ আছে যা পূরণ হবে এক দশক ধরে, কিছু চলবে ১৫ থেকে ২৫ বছর ধরে এবং কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে স্থায়ীভাবে। যাহোক এই চুক্তির মেয়াদ বাড়বে কেবল আইএই যখন ইরানকে পরমাণু পরিচ্ছন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে এবং এরপর সংস্থাটি কর্তৃক কঠোর পরিদর্শন কাজ চলবে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে অঙ্গীকার করেছি। তাছাড়া এই চুক্তির কোনো নিশ্চয়তা নেই যদি ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি সারাজীবনের জন্য চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। আর সামরিক হস্তক্ষেপ ভালো ফল বয়ে আনবে না আমাদের জন্য। কারণ এই পদক্ষেপ হবে ব্যয়বহুল এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাও বাড়াবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা আইনপ্রণেতা এবং সমালোচকদের চুক্তির পক্ষে আনতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে বিশ্বশক্তি। কিন্তু মার্কিন রিপাবলিকানরা চুক্তির আগে এর পর্যালোচনায় কংগ্রেসের অনুমতি নিতে ভোটাভুটির আয়োজনেরও দাবি তুলেছেন। তারা ইসরাইলকে সমর্থন দিচ্ছে এবং ইসরাইল তো চুক্তির শুরু থেকেই কঠোর নিন্দা জানিয়ে আসছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পরমাণু কর্মসূচি হ্রাস করার বিনিময়ে বিশ্বশক্তি ইরানের উপর থেকে ধাপে ধাপে অবরোধ প্রত্যাহার করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও একই ঘোষণা দিয়েছেন। তবে রিপাবলিকানরা এর বিরোধিতা করবে বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার সঙ্গে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নয়। তিনি ইসরাইলের এই দাবিকে ‘মৌলিক ভুল বিচার’ বলেও উল্লেখ করেন। সম্প্রতি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি হলে ইসরাইল অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে এই চুক্তিতে ইরানের ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরাইলের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এই শর্ত আরোপ করার অর্থ হবে আমরা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে চাই না। রিপাবলিকানরা ওবামার এই চুক্তির বিরোধিতা করলেও দেশটির জনসমর্থন কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তিকে সমর্থন করে দেশটির বিরোধী রিপাবলিকান দলের ৩১ শতাংশ সমর্থক।