বৈশাখী মেলা এখন শহরজুড়ে একটি পরিচিত বিষয়। ঘরে বসে, কিংবা অনলাইনে যারা ব্যবসা করেন তারা সাধারণত এই মেলায় অংশ নেন। কাজের পরিধি বাড়াতে এই মেলা বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে তারা মনে করেন। আর নিজের দক্ষতা বাড়াতে তারা নিয়ে নেন কিছু প্রশিক্ষণ— এমন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া কয়েজনকে নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। জানাচ্ছেন শেফালী রাণী মল্লিক, ফারাহ্ দিবা,সুরাইয়া বেগম, তানিয়া সুলতানা, রায়হানা ঝুমু। এদেরে কেউ নিতান্তই গৃহিণী ছিলেন, কেউ বিধবা অসহায় নারী, কেউ আবার মা হয়ে চার দেয়ালের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রেখে ছিলেন বাধ্য হয়েই। কেউ পড়াশুনা না করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, আবার কেউ পড়াশুনা শেষ করে সংসারে আবদ্ধ হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন। তাদের সকলের জীবনে অর্থ নৈতিক মুক্তি এনে দেয় জাতীয় মহিলা সংস্থার স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ। জানাচ্ছেন রাবেয়া বেবী
প্রশিক্ষণে সুযোগ সৃষ্টি
ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর দ্বারপ্রান্তে, সেই সময়ই (২০১২সালে) স্বামী স্বর্গবাসী হন। সন্তানদের তেমন অসুবিধা না হলেও একজন আত্মসম্মানবোধ সমপন্ন মানুষ হয়ে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে নারাজ শেফালী রাণী খুঁজছিলেন নিজে কিছু করার পথ। সেই সময় তিনি তিনমাসের পটারি ট্রেনিং নেন। ট্রেনিংই তার সামনের অনেক সুযোগ এনে দেয়। বর্তমানে গোল্ড প্লেট গহনার ব্যবসা করেন আর স্বামীর রাখা স্বর্ণের দোকানটাও কর্মচারীকে সাথে নিয়ে দেখাশোনা করে চলেছেন তিনি। গহনার পাশাপাশি উন্মেশে বিক্রি করেন পোশাকও। শেফালী মনে করেন, প্রত্যেক মানুষেরই হাত আর কাজ করার সমর্থ থাকলে বসে থাকা উচিত নয়। আজ তিনি কাজের জন্যই অনেক মানুষের সাথে মিশছেন স্বপ্ন দেখছেন এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহিলা কাউন্সিলর হয়ে মানুষের সেবা করার।
ইচ্ছা থাকলে পথ পাওয়া যায়
ফারাহ দিবার বাড়ি মগবাজেরর পেয়ারা বাগে। বাড়িতেই তিনি তার উত্পন্ন পণ্য-শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, বেডসিট বিক্রি করেন। আর বছরের বিভিন্ন সময়ে ৬/৭টি মেলায় অংশ নেন। মেলায় তার পরিচিতি বাড়ে আর বিক্রিও ভালো হয় বলে জানান তিনি। নয় বছর ধরে তিনি নিজের উদ্যোগে ব্যবসা করে চলেছেন। এর আগে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছুদিন চাকরিও করেছেন। পরপর ছেলেমেয়ের এসএসি পরীক্ষার জন্যই তার চাকরি ছাড়তে হয়। মা হিসেবে সন্তানদের পাশে থেকে সহযোগিতা করার দায় যেমন মিটিয়েছেন তেমন অবসর সময়টায় ঘরে বসেই কিছু করার পথ খুঁজেছেন। সরাক্ষণতো তাদের জন্য ব্যয় হয় না, ঘরে বসে কিছু করার নিমিত্তে ট্রেনিং নেন। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা ফারাহ এখন ঘরে বসে মাসে ত্রিশ হাজার টাকা আয় করেন। কয়েকজন আছে তাকে সহযোগিতা করার জন্য।
মহিলা সংস্থার হয়ে কাজ করছি
সুরাইয়া বেগম, তানিয়া সুলতানা, রায়হানা ঝুমু আছেন জাতীয় মহিলা সংস্থা পরিচালিত ‘অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশ সাধন প্রকল্পের স্টলে। তারা নিজেরা বাড়িতে বুটিকশপ খুলে বসেছেন। তাদের ট্রেনিং আছে। তারপরও যে প্রতিষ্ঠান (মহিলা সংস্থা) ট্রেনিং দিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কাজ করেছে, আজ তারা মাসিক ১০ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে সেখানেও কাজ করেন। তিনজনের মধ্যে সবার ছোট তানিয়া জানান, এখনও তার বিয়ে হয়নি। এসএসসি পর্যন্ত পড়াশুনা করে ট্রেনিং নিয়ে কর্মজীবী হয়েছেন অন্যদের বেশ আগে। নিজে আয় করার মতো আনন্দ কত বড় তা অল্প বয়সে কাজ না করলে বুঝতে পারতেন না। তাদের প্রত্যেকেরই আয় ত্রিশ হাজার টাকার বেশি।
যুব পুরস্কার পেয়েছি
ছেলেবেলা থেকেই ঘরকন্যার কাজে বিশেষ আগ্রহ ২০১৩ সালের রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননা পাওয়া নাজনীন পারভীনের। সেই অনুভূতি সত্যি বর্ণনার অতীত বলে জানান নাজনীন। তিনি বলেন, পুঁজির অভাব, ঘর-সংসার আর প্রতিবন্ধকতার যত বাধাই থাকুক না কেন সত্যি কিছু করতে চাইলে একদিন ঠিক প্রতিষ্ঠা আসে। মেয়েরা ঘরে বসে সিরিয়াল দেখে আর সন্তানদের স্কুলে বসে আড্ডা না দিয়ে আয়ের কাজে সময় ব্যয় করতে পারে। সেজন্য ট্রেনিং বিশেষ ভূমিকাও রাখে বলে মনে করেন তিনি। তিনি একাধিক স্থান থেকে একাধিক বিষয়ে ট্রেনিং নিয়েছেন। উত্সব পার্বনে প্রায় শতাধিক কর্মী কাজ করেন তার সাথে। গোপীবাগে তার ট্রেনিং সেন্টার ও বিক্রয় কেন্দ্র আছে। বর্তমানে তার মাসিক আয় ৬০ হাজার টাকার মতো।
বিনা পয়সায় উদ্যোক্তা
বিয়ের পর নিজে কিছু করার ইচ্ছা থেকেই স্বামী সংসারের পরের সময় টুকু কাজে লাগান শামীমা কবীর। শামীমা জানান, এই কাজ শুরু করতে তার তেমন কোন টাকা খরচ হয়নি। নিজের সংসার খরচের বেঁচে যাওয়া টাকায় কাপড় কিনে সুই সুতায় নকশা করে এককথায় বিনে পয়সায় তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এখন তিনি ট্রেনিং সেন্টারসহ চারটি প্রতিষ্ঠান চালান। শামীমা মনে করেন, করার ইচ্ছাটা থাকলে বাকিগুলো ম্যানেজ হয়ে যায়। তিনি বেশ কিছু ট্রেনিং নেন। ট্রেনিংগুলো অবশ্যই কাজকে এগিয়ে নিতে এবং পরিকল্পিতভাবে করার সহায়ক।
স্বামী হারিয়ে কাজ শুরু করি
শাহানা মুক্তার স্বামী মারা যান ছয় বছর আগে। ছোট মিশু নিয়ে এককথায় বিপদেই পড়ে যান তিনি। ঠিক করেন বসে থাকলে বিপদ আরও বেড়ে যাবে। তাই ট্রেনিং নিয়ে কাজ শুরু করেন মুক্তা। আজ নিজের এলাকাতে তারমত অসহায় মেয়েদের জন্য ট্রেনিং দেয়ার জন্য করেছেন ট্রেনিং সেন্টার। তিনি দেশ ও দেশের বাইরে শো-পিস তৈরি, টেইলারিং, বিউটিফিকেশন প্রভৃতি বিষয় ট্রেনিং নেন।