চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস পর্যন্ত রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অর্থবছর শেষ নাগাদ এই ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
বিগত কয়েক মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার জেরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি হারায়। ফলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আসেনি। অন্যদিকে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয় কমে যাওয়ায় লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে আয়করও। এ পরিস্থিতিতে রাজস্বে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা উচিত বলে মনে করছেন তারা। পরিস্থিতি আঁচ করে সরকারও এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা থেকে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা কমাতে যাচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। ব্যবসা খারাপ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ভ্যাট দিতে চাইবে না। এসব কারণে ব্যাংকিং খাতে অপরিশোধিত ঋণ বাড়তে থাকায় কর্পোরেট ট্যাক্স আদায়ও কমবে। ফলে স্বভাবতই রাজস্ব আদায় বড় ধাক্কা খাবে।
অর্থমন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত ৯ মাসের রাজস্ব আদায়ের উপর প্রাথমিক একটি হিসাব করেছে রাজস্ব বোর্ড। আলোচ্য সময়ে সাড়ে ৯৬ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা। আর বাকী তিন মাসে আদায় করতে হবে আরো প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
আমদানি শুল্ক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সমর্থ হলেও ভ্যাট ও আয়কর পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য ১৫ এপ্রিলের পর ভ্যাট আদায়সহ প্রকৃত রাজস্বের চিত্র জানা যাবে। অবশ্য গত ৯ মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। আয়কর ও শুল্ক আদায় বেড়েছে যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ১৪ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় নিয়ে সমপ্রতি একটি পর্যালোচনা করেছে রাজস্ব বোর্ড। তারা মনে করছে, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতে পারে। গত অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা ছিল। তবে রাজস্ব আদায়ের শ্লথগতি দেখে পরবর্তীতে এ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু বছর শেষে তাও অর্জন করতে ব্যর্থ হয় সরকার।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) একটি পর্যালোচনা করেছে। এনবিআর ও এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। সিপিডি মনে করছে এর মধ্যে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হবে। এই ঘাটতির বড় অংশই হবে এনবিআর রাজস্বের। সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ইত্তেফাককে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এনবিআরের জন্য দেড় লাখ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রাও অনেক বেশি ছিল। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা যৌক্তিক হবে। রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা এবং সরকারি ও বেসরকারি যে সব খাতে বিশাল পরিমাণ রাজস্ব আটকে রয়েছে তা উদ্ধারে মনযোগী হতে হবে।
এনবিআরের হিসাবে, বিভিন্ন মামলায় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে রয়েছে। এনবিআর আশা করছে আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে চলতি অর্থবছরেই এর কিছু অংশ আদায় করতে পারবে। এছাড়া এনবিআরের দাবি অনুযায়ী, সরকারি খাতের চারটি গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানির কাছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তনের নামে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ চারটি মোবাইল ফোন কোম্পানির বিরুদ্ধে।
এনবিআর আশা করছে, অর্থবছরের বাকী তিন মাসে এসব অর্থের কিছু অংশ পাওয়া গেলে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তা সহায়ক হবে। বছরের পর বছর ঝুলে থাকা এসব অর্থ অবশ্য তিন মাসে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।