বাংলা সাল, নববর্ষ উদযাপন ও মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাংলা সন সবসময়ই কৃষিভিত্তিক। আজও আমাদের কৃষকসমাজ বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করেই হাল চালান, ফসল ফলান। ফসলি সনের সাথে কৃষকের আত্মার সম্পর্ক। মাঠের শ্রম যখন ফসল হয়ে ঘরের আঙ্গিনায় উঠে, আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন পূরণে আশাবাদ জাগে তখন উত্সবের আমেজ পাওয়া যায়।  আগে উত্সবগুলো ঘিরে গ্রামে গ্রামে গ্রামীণ সংস্কৃতির যে সকল আসর বসত মেলা তার অন্যতম। এ সকল উত্সবে আনন্দে মেতে থাকত   গ্রামের মানুষ।
 

 
সম্রাটের সাম্রাজ্য নেই। রাজা-রাজড়াদের রাজত্বও নেই। প্রজাদের আর রাজার মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থাকতে হয় না। এমন একটা দিন ছিল যখন রাজাদের সুখেই প্রজাদের সুখ। রাজাদের দুঃখেই প্রজাদের দুঃখ।
 
আমাদের এই উপমহাদেশের শিল্প-সাহিত্য, কবিতা, গান, নাটক ও চলচ্চিত্র সর্বত্রই তার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। কিন্তু দিন বদলেছে। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায়, সমাজ সচেতনতায় মানুষ নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নেয়ার অবারিত সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানো আছে ঠিকই কিন্তু এমন ক্ষমতাধরও আছে যারা উল্টো শাসকগোষ্ঠীর ওপরই ছড়ি ঘুরিয়ে থাকে। সবকিছু পাল্টে গেলেও, বদলে গেলেও ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সেই পুরোনো নিয়মের নতুন আদলে সর্বত্র চালিত হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র। বাংলা সাল ও নববর্ষ উদযাপন বলা চলে তারই ধারাবাহিকতা। সেই ধারাবাহিকতায় নববর্ষ উদযাপন আজ নতুন মাত্রা পেয়েছে। পারস্পরিক সম্প্রীতি, ক্রয়-বিক্রয় ও উত্সবের রকমফেরে আজ এসেছে বৈচিত্র্য। তবে হারিয়ে গেছে ঐতিহ্য ও সম্প্রীতি। কর্পোরেট সংস্কৃতির যুগে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপের পরিবর্তে শহুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে দিকে দিকে। বাংলা সালের উত্পত্তি ও নববর্ষ উদযাপনের শুরু সেই মোগল আমলে।
 
মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) তার রাজসভার জ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে একটা সার্বজনীন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সৌরমাসভিত্তিক একটা ফসলি সাল উদ্ভাবন করেন। সম্রাট আকবরের দিল্লির সিংহাসনে আরোহনের দিনকে স্মরণীয় রাখতে ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ধরে সাল গণনা করার রীতি প্রবর্তন করা হয়। সম্রাট আকবর তার রাজত্বকালে ভারত উপমহাদেশের সর্বত্র এই ফসলি সনের শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে এই ফসলি সনের নামই বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ হয়েছে। এর আগে বড় বড় রাজা-বাদশারা নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বা ধর্ম প্রচারকরা জীবনের কোনো বিশেষ দিন থেকে সাল বা অব্দ গণনা করতেন। এভাবে শকাব্দ, কলাব্দ, বিক্রমাব্দ, গুপ্ত সংবত্, জালালী সাল, হর্ষাব্দ, পালাব্দ, হিজরি অব্দ, ইত্যাদি সাল বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে প্রচলন ছিল। যেমন গুপ্ত সাম্রাজ্যে চালু ছিল গুপ্তসংবত্, পাল বংশের সময় পালাব্দ, সেন আমলে শকাব্দ।
 
সম্রাট আকবরের প্রচলিত সৌরমাসের প্রতিটি দিনের এক একটা স্বতন্ত্র নাম ছিল। এক মাসের ৩০ বা ৩১ দিনের আলাদা আলাদা নাম দিয়ে মাসকে চেনানো হতো। পরে সম্রাট শাহজাহানের সময় এমন কঠিন ও জটিল পদ্ধতির সাল গণনাকে সহজ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এক একটা মাসকে ৪ ভাগে ভাগ করে ৭ দিনের সপ্তাহ গণনার শুরু। সপ্তাহের ৭ দিনের ৭টা পৃথক নামও নির্ধারণ করা হয়। সম্রাট শাহজাহানের দরবারে এক পর্তুগিজ মনীষী গ্রহরাশি থেকে সপ্তাহের ৭ দিনের নাম রাখেন। যেমন Sun বা সূর্য থেকে রবি, Monan অর্থাত্ Mon থেকে সোম, Mars থেকে মঙ্গল, Mercury থেকে বুধ, Jupiter থেকে বৃহস্পতি, Venus থেকে শুক্র এবং Satu থেকে শনি। তারপরও বাংলা সালের নানা সংস্কার হয়েছে। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ১৯৬৩ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৩৭১ সালের বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৫ মাস ৩১ দিনের আর আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৭ মাস ৩০ দিনের এবং লিপইয়ার হলে চৈত্র মাস ৩১ দিনের গণনা করার সুপারিশ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলা সাল চালু করে। এখন ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা সাল আমাদের জন্য আপাতত এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের জন্য এই কারণে যে, এপার-ওপার বাংলায় এখন দু’ ধরনের বাংলা সাল চালু আছে, যা আমরা সকলেই জানি। বাংলা ও বাঙালিকে দ্বিধাবিভক্ত করার এ এক সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল কিনা জানি না। তবে উত্সব আজ আলাদা আলাদাভাবেই পালিত হচ্ছে।
 
বাংলা সন সবসময়ই কৃষিভিত্তিক। আজও আমাদের কৃষকসমাজ বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করেই হাল চালান, ফসল ফলান। ফসলি সনের সাথে কৃষকের আত্মার সম্পর্ক। মাঠের শ্রম যখন ফসল হয়ে ঘরের আঙ্গিনায় উঠে, আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন পূরণে আশাবাদ জাগে তখন উত্সবের আমেজ পাওয়া যায়। আগে উত্সবগুলো ঘিরে গ্রামে গ্রামে গ্রামীণ সংস্কৃতির যে সকল আসর বসত মেলা তার অন্যতম। এ সকল উত্সবে আনন্দে মেতে থাকত গ্রামের মানুষ। মেলায় মানুষের ঢল নামত। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে হৈচৈ করে বেড়াত আবাল বৃদ্ধ বণিতা। মেলাকে ঘিরে হস্তশিল্পের নহর বয়ে যেত। কৃষক তার সারাবছরের ঘর-গৃহস্থালির সরঞ্জাম এখান থেকেই সংগ্রহ করতেন। বলা চলে মেলাকে ঘিরে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া এবং উত্সবে গা ভাসিয়ে বিনোদনের যে সুখস্মৃতি তারা উপভোগ করতেন তা আজ আর নেই। সেই কৃষ্টি-কালচার-উত্সব গ্রামে হারিয়ে যেতে বসেছে। তার পরিবর্তে শহুরে উত্সবে উত্সাহ বেড়েছে কয়েকগুণ। গ্রামের আনাচে-কানাচে কে আর পৃষ্ঠপোষকতা করতে চায়। ইলেক্ট্রিক প্রচার মাধ্যমে কর্পোরেট সহযোগিতার ছবি দেখা না গেলে পণ্যের বিপণনই বা হবে কিভাবে। তাই শহরে কর্পোরেট পুঁজির সহযোগিতায় উত্সবে উত্সাহ বেড়েছে। কিন্তু সেখানে গ্রামের সেই প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যায় না। মাটির সানকিতে একদিন পান্তা-ইলিশ খেয়ে গ্রাম-বাংলার সেই সুখস্মৃতি কি কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যাবে।
 
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে এখন নানা ধরনের বর্ণিল আয়োজন হতে দেখা যায়। তবে আজও মঙ্গল শোভাযাত্রা রয়েছে এর সর্বাগ্রে। পহেলা বৈশাখ ভোরে বর্ণিল আয়োজনে এখন রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়ে থাকে। প্রায় তিন দশক হতে চলল এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটা আমাদের বৈশাখ উদযাপনে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। আমরা দেখে নেব মঙ্গল শোভাযাত্রা কিভাবে শুরু হলো। সাল ১৯৮৫। দেশে সামরিক স্বৈরাচার। রাজনৈতিক অস্থিরতায় মানুষের জীবন দুর্বিষহ। সমাজের সর্বস্তরে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরাও যাপন করছে একই অবস্থায়। যেন অনেকটা বন্দী জীবন। এমন একটি সময়ে কয়েকজন তরুণ ঢাকার চারুকলা অনুষদের পাট চুকিয়ে ফিরে আসেন নিজ জেলা শহর যশোরে। তাদের মধ্যে ছিলেন মাহবুব জামাল শামীম ও হিরন্ময় চন্দও। প্রথমেই তারা গড়ে তুললেন চারুশিল্পের প্রতিষ্ঠান ‘চারুপীঠ’। মাহবুব জামাল শামীমের কথায়, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল চারুকলার বিকাশ ঘটিয়ে মানবজীবনের উন্নয়ন ও উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা। শিল্পচর্চার মাধ্যমে শিল্পের নতুন পথের সন্ধানে শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তারা। নিজেদের ভাবনা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছাটাও ছিল প্রবল।
 
চারুপীঠ শিল্পীরা ভাবলেন, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সবারই আলাদা উত্সব আছে। কিন্তু এমন একটি উত্সব চাই যেটা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিজের উত্সব বলে মনে করবে। শিল্পী হিরন্ময় চন্দ প্রস্তাব করলেন পহেলা বৈশাখের কথা। শিল্পাচার্য জয়নুলের ফোক ভাবনা আর সুলতানের গণমানুষের চেতনা মাথায় রেখে ১৯৮৫ সালে বাংলা নতুন বছর বরণের আয়োজন করে চারুপীঠ।
 
শামীম, হিরন্ময়, গোলাম দস্তগীরদের আয়োজনে চৈত্রের শেষ রাতে একুশের মতো আলপনা আঁকা হলো যশোর শহরজুড়ে। শোভাযাত্রার জন্য মাহবুব জামাল শামীম তৈরি করলেন পরী ও পাখি, হিরন্ময় চন্দ তৈরি করেন চমত্কার একটি বাঘের মুখোশ। পহেলা বৈশাখে মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে এলো। সানাইয়ের সুরে, ঢাকের বোলে নেচে-গেয়ে সেই শোভাযাত্রা প্রদক্ষিণ করল যশোর শহর। সব শ্রেণির মানুষ এসে যোগ দিলেন সেই শোভাযাত্রায়। জন্ম নিল এক নতুন উত্সবের—মঙ্গল শোভাযাত্রা। কয়েক বছর পর এই আয়োজন শুরু হয় ঢাকাতে। এখন সারাদেশে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও। এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতীতেও পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রা হয়। তাদের এই আয়োজনও যশোর অনুসরণে।
 

এবারের পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘অনেক আলো জ্বালতে হবে মনের অন্ধকারে’। বাঙালি মনে-প্রাণে, চলনে-বলনে, চিন্তা-চেতনায় জাগ্রত হোক, নির্ভয়ে পথ চলতে উদ্বুদ্ধ হোক এই কামনা। পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপনে কর্পোরেট পুঁজির দৌরাত্ম্যে আমাদের স্বকীয়তা যেন হারিয়ে না যায়, উত্সবে-আমেজে ফিরে আসুক প্রাণের স্পন্দন, যাতে প্রতিটি বাঙালি সামিল হতে পারে— সম্প্রীতির অটুট বন্ধনে বাঁধতে পারে নিজেদের। সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ।