রামপুরায় দোতলা টিনের ভবন দেবে গিয়ে ১২ জনের নিহত হওয়ার ঘটনায় অবৈধভাবে ওই বাড়ি নির্মাণ করায় স্থানীয় যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান চৌধুরীর নামে মামলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে রামপুরা থানা পুলিশ এ মামলা দায়ের করে। মামলা নং- ১৯।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই মনির হোসেন পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতার করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সারাদিনই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতা চালিয়েছে।
স্থানীয়দের ধারণা এ ঘটনায় আরো অন্তত ১৫ জন নিখোঁজ রয়েছে। এ ঘটনায় গত বুধবারে উদ্ধার হওয়া ১২ জনের লাশের বাইরে আজ আর কোন লাশ পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ডিরেক্টর এ কে এম মেজর সাকিল জানান, উদ্ধার কাজ দ্রুত করার মতো কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাসার যাবতীয় আসবাবপত্র নিয়ে দেবে যাওয়ায় পানির নিচের উদ্ধার কাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া পানি ময়লাযুক্ত হওয়ায় আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা ডুবুরিরা। এ জন্য সময় একটু বেশি লাগতে পারে।
উদ্ধার অভিযান আর কত সময় চলবে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক এ বি এম নুরুল হক জানান, এ ঘটনায় একজন পর্যন্ত নিখোঁজ থাকলেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
তিনি সাংবাদিকদের জানান, উপর তলার ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন নিচ তলার ধ্বংসাবশেষ টুকরা টুকরা করে কেটে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ধ্বংসস্তুপ উদ্ধারে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ।
ভুক্তভুগীদের বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেন, পানির নিচে দেবে যাওয়া অংশে আরো লাশ থাকতে পারে। ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কাজে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত ধ্বংস স্তুপ সরানো হলে ডুবুরি দিয়ে নিচে তলল্লাশি চালানো হবে। একজন পর্যন্ত নিখোঁজ থাকলেও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। তবে বৃহস্পতিবার সারাদিনে নতুন করে কোনো মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঢাকা-১৭) একেএম রহমত উল্লাহ।
তিনি এসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, রামপুরা ট্র্যাজেডির মূল হোতা মনিরুজ্জামান চৌধুরী মনিকে ছাড় দেয়া হবে না। মনিরুজ্জামান যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে পার পাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে রহমত উল্লাহ বলেন, প্রশ্নই উঠে না। তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ না আওয়ামী লীগ নেতা তা দেখা হবে না। মনিরুজ্জামানকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
অপরদিকে মনিরুজ্জামানের দখলকৃত জায়গাসহ আশপাশের সকল সরকারি জায়গা শিগগিরই উচ্ছেদ করে সেখানে খেলার মাঠ তৈরি করা হবে বলে জানান রহমত উল্লাহ।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন ঢাকা জেলা প্রশাসক শেখ তফাজ্জল হোসেন মিয়া ও স্বরাষ্ট্র সচিব মফাজ্জল হোসেন খান।
জেলা প্রশাসক তফাজ্জল হোসেন মিয়া জানান, এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল হককে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র সচিব মফাজ্জল হোসেন খান বলেন, যারাই এই বাড়ি প্রস্তুত করেছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রামপুরা থানার পুলিশ জানায়, সরকারি খাস জমি দখল করে টং বাড়ি নির্মাণের অভিযোগে মনরিুজ্জামানের নামে মামালা দায়ের করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এদিকে দেবে যাওয়া বাড়িটির ক্ষতিগ্রস্ত ভাড়াটিয়া বলেন, সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে রামপুরা ঝিল পাড়ের ঝিলের উপরে বাঁশ-কাঠের ঠাট করে লোহার এঙ্গেল দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের তথ্য-গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মনিরুজ্জামান চৌধুরী এ দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটি চলতি বছরের শুরুতে চরম ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়লে ভাড়াটিয়ারা তাকে সংস্কারের জন্য অনুরোধ করে। ভাড়াটিয়ার একাধিকবার অনুরোধ করা সত্বেও তিনি সেটা সংস্কার করেনি।
ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া রিকশাচালক আলী বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ের সময় নড়বড়ে অবস্থা দেখে ম্যানেজারকে বলা হয়েছিল খুঁটি মজবুত করার জন্য। কিন্তু তারা তা করেনি। মাস শেষে ঠিকই ভাড়ার জন্য বাসায় এসে বসে থাকতেন ম্যানেজার। কিন্তু মেরামতের কথা বললেই কেটে পড়েন।
ভাড়াটিয়া রিপন বলেন, তাদের বার বার বলার পরেও বাড়িটি মেরামত করলো না। তারা তাদের মতো করেই আসা যাওয়া করতো শুধু ভাড়া নেয়ার সময় হলে। তারা স্বার্থপরের মতো আচরণ করেছে আমাদের সঙ্গে। তাদের বিচার হওয়া উচিত।
ভাড়াটিয়া নাসরিন জানায়, তার বেতনের জমানো টাকা দিয়ে কেনা দুইটি সেলাই মেশিন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রসহ কিছু নগদ টাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই ঝিলের উপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা আরো অন্তত অর্ধশতাধিক টিনশেডের বাড়ি রয়েছে। ঝিলের মধ্যে ও ঝিলের পাড় দখল করে এসব বাড়ি গড়ে তোলা হয়েছে। ঝিলের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম সবদিকের পাড় দখল করেই এসব বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। আর এই বাড়িগুলোতে বর্তমানে অন্তত এক হাজার মানুষ বসবাস করছে।