সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের যেসব প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার অনেকগুলোই অচেনা এবং বিভ্রান্তিকর। এসব প্রতীক নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা। তারা মনে করেন, ভোটের লড়াইয়ে প্রতীক তাদের বিপদে ফেলে দিতে পারে। ক্ষুব্ধ নারী সংগঠনগুলোও। তারা দাবি করেছেন, নারী প্রার্থীদের হাস্যকর কিছু প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তালিকায় এমন প্রতীকও রয়েছে যা সাধারণ ভোটারদের কাছে অপরিচিত। দেশি ফল বাদ দিয়ে রাখা হয়েছে বিদেশি ফল। নির্বাচন কমিশন অফিসিয়ালি যে তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে অনেক প্রতীকের ছবি নিয়ে অস্পষ্টতাও রয়েছে।
আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবার সম্পূর্ণ নতুন প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রায় একই ধরনের প্রতীক ব্যবহার করা হতো। শুধু জাতীয় নির্বাচনের প্রতীক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সংরক্ষিত থাকত। কিন্তু কয়েক মাস আগে নির্বাচন কমিশন প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের জন্য আলাদা প্রতীক নির্ধারণ করে। এটি করতে গিয়ে ভোটারদের কাছে পরিচিত কিছু প্রতীক বাদ দেয়া হয়। বিশেষ করে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয় আনারস, তালা, হাঁস, টেলিভিশন ইত্যাদি প্রতীক।
নির্বাচন কমিশন সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালা সংশোধন করে ৩৪টি প্রতীক সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে মেয়র পদে ১২টি, কাউন্সিলর পদে ১২টি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ১০টি প্রতীক আলাদা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নির্বাচনে প্রার্থী বেশি হওয়ায় উপরোক্ত তিনটি পদের জন্য অতিরিক্ত আরো ৩০টি প্রতীক সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে মেয়র পদে সংরক্ষিত ১২টি প্রতীকের মধ্যে দুটি প্রতীক নিয়ে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল পোস্টারে অঙ্কিত ক্রিকেট ব্যাটটি দেখতে অনেকের কাছে বোতলের মতো মনে হয়। কমলা লেবুটি অনেকেই চিহ্নিত করেছেন ডালিম হিসেবে। প্রসঙ্গত, অফিসিয়াল পোস্টারের হুবহু নমুনাই ব্যালট পেপারে থাকবে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ভোটারদের ৩৫ শতাংশই বস্তিতে বাস করেন। এদের একটি বড় অংশ তেমন শিক্ষিত নন। ভোটারদের অনেকের কাছেই টেলিস্কোপ, ডিশ অ্যান্টেনা, প্রেসার কুকার, স্ট্রবেরি, ক্রিসমাস ট্রি, এয়ার কন্ডিশনার, ভায়োলিন পরিচিত নয়। আনারস দেশি ফল হলেও সেটি তালিকায় রাখা হয়নি, রাখা হয়েছে বিদেশি ফল স্ট্রবেরি। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। সাধারণত জাতীয় পরিচয় বহনকারী প্রতীকগুলো অতীতে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।
প্রতীক নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে নারী সমাজে। মহিলা পরিষদ বলেছে, শিল পাটা, ভ্যানিটি ব্যাগ, খাঁচা, কলস ইত্যাদি প্রতীক দিয়ে নারীদের অবজ্ঞা করা হয়েছে।
প্রতীককে ভোটারদের কাছে পরিচিত করার জন্য প্রার্থী এবং তাদের কর্মীরা ডামি ব্যালট নিয়ে ঘরে ঘরে যেতেন। ফলে ব্যালট পেপারে প্রতীকের কিছুটা অস্পষ্টতা থাকলেও ডামি ব্যালট পেপার নিয়ে প্রচারণার কারণে প্রতীক চেনা অনেক সহজ হতো। শামসুল হুদার কমিশনের সময় ডামি ব্যালট পেপার ছাপানো নিষিদ্ধ এবং শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সিটি নির্বাচনে কমিশন যে ব্যালট পেপার সরবরাহ করবে তাতে প্রতীকের নিচে কোনো নাম লেখা থাকবে না। ফলে কমলা লেবু না ডালিম, ক্রিকেট ব্যাট না পানীয়ের বোতল তা চিনতে অনেক অসুবিধা হবে। প্রতীকের নিচে নাম লেখা থাকলে ব্যালট পেপারের ছাপার যে অস্পষ্টতা, তা অনেকটা দূর হতো। ইত্তেফাকের কাছে প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রতীক আমাদের বিপদে ফেলে দিতে পারে। আমাদের পরিশ্রম প্রতীকের অস্পষ্টতার কারণে বিফলে যেতে পারে। তারা বলেন, অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন, যারা এমনিতেই চোখে কম দেখেন। তাছাড়া যে কক্ষে ব্যালট পেপারে সিল দেয়া হয়, সেটি সাধারণত বদ্ধ স্থানে নির্মিত হয়। আলো স্বল্পতার কারণেও ভোটারদের সমস্যা হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক— সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনপ্রিয় প্রতীকগুলো নির্বাচন কমিশন বাদ দিলেও তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তারা সবকিছুই কঠিন করে ফেলে। রাজনৈতিক দলের জন্য সংরক্ষিত নয়, এমন পরিচিত প্রতীকগুলোও ব্যবহার করলে কী এমন অসুবিধা হতো!
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম আসাদুজ্জামান বলেন, এক ভোটেও অনেক সময় প্রার্থীর পাস-ফেল নির্ধারিত হয়। প্রতীকের বিভ্রান্তিতে বা ছাপার অস্পষ্টতার কারণে যদি কোনো ভোট বাতিল হয়, সেটি হবে দুঃখজনক। কেননা ভোটাররা তাদের পবিত্র আমানত প্রয়োগ করতে পারলেন না। তিনি বলেন, আমাদের দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনও শিক্ষার আলো থেকে দূরে রয়েছে। তারা চেনে না এমন প্রতীক প্রার্থীদের দেয়া সত্যিই হাস্যকর।
প্রতীক বরাদ্দের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই প্রথম আমরা সব নির্বাচনের জন্য আলাদা প্রতীক নির্ধারণ করেছি। এ কারণে কিছু প্রতীক বাড়াতে হয়েছে। সংরক্ষিত পদের প্রতীক নিয়ে প্রার্থীরা আপত্তি তুলেছেন, এটা আমাদের কানেও এসেছে। আসলে প্রতীক দেয়া হয় চিহ্নিত করার জন্য, কাউকে ঘরে ঢুকানো বা ছোট করার জন্য না। তার পরও যদি কোনো প্রার্থী প্রতীকের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেন আমরা বিবেচনা করব।’