আইএমএফ-এর প্রাক্কলন

আগামী দুুই বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি আরেকটু বাড়বে। তেলের মূল্যের পতন ও এবং উন্নত দেশগুলোর কৃচ্ছ্রতা কর্মসূচীগুলোয় শৈথিল্যের সূত্র ধরেই এমনটি সম্ভব হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন-ভিত্তিক সংগঠনটি সম্প্রতি সতর্ক করে দিয়েছে এই বলে যে, ২০০৮ সালের আর্থিক পতনের পর অধিক টেকসই উত্তরণের নিশ্চয়তা অর্জনের ব্যর্থতা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির নড়বড়ে অবস্থাটা আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে। আইএমএফ তার ষান্মাসিক ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক আউটলুক-এ প্রাক্কলন করেছে, এ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে ৩.৫ শতাংশ, যা কিনা গত জানুয়ারির শেষ আপডেট এর সমান। তবে ২০১৬ সালে সেটি দাঁড়াবে ৩.৮%। আগের প্রাক্কলনে তা আরো ০.১% শতাংশ কম ছিল। আইএমএফ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে, যেসব “জটিল শক্তি” ২০১৪ সালে বৈশ্বিক কার্যক্রমকে আক্রান্ত করেছিল, সেগুলোর অস্তিত্ব এখনও বহাল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুদ্রার বিনিময় হারের ব্যাপক উঠানামা এবং পতনশীল দ্রব্যমূল্য।
 
আইএমএফ আরো জানিয়েছে, বিস্তৃত ঋণের পাহাড় এবং ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানের বুড়িয়ে যাওয়া জনসংখ্যার মতো দীর্ঘমেয়াদী  ইস্যুগুলো অনেক দেশের “উত্পাদনমূলক সক্ষমতা”-কে কমিয়ে দিয়েছে। এর আগে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিএ)  তাদের ভবিষ্যদ্বাণী সংশোধন করে জানিয়েছে,  এ বছর বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ নয়, প্রকৃতপক্ষে তা হবে ৩.৩ শতাংশ। ডব্লিউটিএ আগের বছরেও তাদের ভবিষ্যদ্বাণী ৩.১ শতাংশ থেকে ২.৮ শতাংশ করেছিল। সংস্থাটির মহাপরিচালক রবার্তো আজেভেদো মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা আশা করি বাণিজ্যে ধীর উত্তরণ চলতেই থাকবে: কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নড়বড়ে অবস্থা এবং আমাদেরকে খুব বেশি আশাবাদী হতে দিচ্ছে না।’ প্রায় একই মনোভাব পোষণ করছেন আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড। তিনি বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতিকে এখন বড়জোর মাঝারি শ্রেণির বলা চলে। এই মাঝামাঝি অবস্থা থেকে ভাল একটা পর্যায়ে যেতে হলে সরকারগুলোর প্রগাঢ় প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত, এমন অনেক ইস্যু রয়েছে। এগুলোর সমাধান করলে প্রবৃদ্ধি ঠিকই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
 
বিশ্ব বিনিময়ে গত বছর জুড়েই ডলারের মান চড়েছে। কিন্তু কমেছে ইউরো ও ইয়েনের মান। স্টার্লিংয়ের মান বেড়েছে অধিকাংশ মুদ্রার বিপরীতে। কিন্তু এ বছর ডলারের বিপরীতে মান কিছুটা কমেছে। আইএমএফ তার সর্বশেষ রিপোর্টে বলেছে, এ বছর এবং আগামী বছর প্রবৃদ্ধির প্রশ্নে বিশ্বে ব্যাপক অসমতা বিরাজ করবে। দরিদ্রতম উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নিম্ন প্রবৃদ্ধি থাকবে আর অধিক উন্নত দেশগুলোয় তা হবে ত্বরান্বিত। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত বছরের তুলনায় উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতির চেহারা বেশি উন্নত হচ্ছে, যদিও উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি নিম্নতর। এ তালিকায় আছে কয়েকটি বৃহত্ বাজার অর্থনীতি ও তেল রপ্তানিকারক দেশ। রিপোর্টে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে রাশিয়াকে নিয়ে। তেলের মূল্য কমে যাওয়াতে আগামী দু’বছরেও অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারবে না তারা। গত এক বছরে ডলারের মানে দেশের অধিকাংশ চাকরিজীবীর বেতন কমেছে এক-তৃতীয়াংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য কমে যাওয়া, ক্রিমিয়া সঙ্কটের কারণে পশ্চিমা অবরোধ এবং দুর্নীতির প্রকোপ— সবকিছু মিলিয়ে রাশিয়ার অর্থনীতিতে এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে। ১৯৮০’র দশকে তেলের নিম্ন মূল্য সোভিয়েত অর্থনীতিকে যেভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল এবারও মনে হয় সেদিকেই এগোচ্ছে। রাশিয়ার রপ্তানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশই আসে হাইড্রোকার্বন থেকে, যা কিনা বাজেট রাজস্বের অর্ধেক। ক্রিমিয়া সঙ্কটের আগে রাশিয়া ছিল বিশ্বের অষ্টম-বৃহত্ অর্থনীতি (২.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) এবং পৃথিবীর সবচে’ ধনী জাতিগুলোর ক্লাব জিএইট-এর গর্বিত সদস্য। কিন্তু পশ্চিমা অবরোধ ও তেলের মূল্য দেশটির বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ‘লৌহমানব’ ভ্লাদিমির পুতিন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চাচ্ছেন না এবং চালিয়ে যেতে চান একগুঁয়েমি।
 
দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহত্ অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের অর্থনীতি খরার কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা দেশটিকে এ বছর মন্দার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে ব্রাজিলের অর্থনীতি আগামী বছর কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াবে। ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার ব্যাঘ্র অর্থনীতিগুলো এ বছর থেকেই ভুগতে শুরু করবে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের কারণে বেশ কিছু বছর ধরেও তাদের প্রবৃদ্ধি উচ্চ। কিন্তু চীনের প্রবৃদ্ধির চাকাই আগের মতো দ্রুতগতিতে আর ঘুরছে না। অনেকে এমনও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, চীন নিম্ন প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হতে পারে।
 
উন্নত অর্থনীতিগুলো, যারা তেল ও গ্যাস আমদানি করে এবং আগে উচ্চমূল্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতো, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি পাবে সামনের দিনগুলোতে আর ভোক্তারা তেলের কম মূল্যের কারণে আরো বেশি সুবিধা ভোগ করবে। জ্বালানির নিম্নমূল্য যে কয়েকটি দেশকে সবচে’ বেশি সুবিধা দিচ্ছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম।  বাকি বিশ্বের পণ্যদ্রব্যের  জন্য ভোক্তা চাহিদার ইঞ্জিনের ভূমিকা পালন করে যাবে তারাই। প্রাক্কলন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধিও শক্ত অবস্থানে থাকবে।
 

—দ্য গার্ডিয়ান অনুসরণে