কর্মজীবী নারীদের দুর্ভোগ

রাজধানীর কর্মজীবী নারীদের যাতায়াত সমস্যা চরমে। বাসে উঠার পারাপারিতে সবসময়ই পিছিয়ে পড়েন নারী যাত্রীরা। সিএনজি চালিত অটোরিকশার ভাড়া মেটাতে নাভিশ্বাস উঠে মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারীদের। যার কারণে বাধ্য হয়েই তাদের শেষ ভরসা বাস সার্ভিস।
 
‘বিআরটিসি’ কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, রাজধানীতে নারীদের জন্য ১৪টি মহিলা বাস চালু রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব বাসের সন্ধান মেলে না বলে অভিযোগ করেন নারী যাত্রীরা। বাধ্য হয়ে প্রতিদিন সকালে তাই প্রতিটি বাস কাউন্টারের সামনে দেখা যায় পুরুষযাত্রীর পাশাপাশি শত শত নারীযাত্রীকে ভিড় ঠেলে ঝুঁকি নিয়ে বাসে উঠতে। রাজধানীর কর্মব্যস্ত নারীদের যাতায়াতের এই ভোগান্তি প্রতিদিনের।
 
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আনোয়ারা সুলতানা আসমা নামে এক নারী যাত্রী বলেন, অফিস যে দূরত্বে তাতে করে বাসে যাতায়াত করা ছাড়া আমার কোন পথ নেই। মোহাম্মদপুর থেকে গুলশান-২ নম্বরে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয় তার। আর এ রুটে বাস রয়েছে হাতে গোনা দুই থেকে তিনটি। সেখানে চাকরিজীবী নারী-পুরুষের সংখ্যা কয়েক হাজার। রোজ সকালে মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডের মাথায় তরঙ্গ বাসের জন্য অপেক্ষা করে হাজার খানেক যাত্রী।
 
মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে ‘দীপন’ বাসের কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে যাত্রী উঠতে দেখা যায়। একইভাবে মৈত্রী, রাজাসিটি, বিআরটিসি’র কাউন্টারে উদ্বিগ্ন মুখে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় নারী যাত্রীদের। সকালবেলা বাসে ভিড়ের প্রধান কারণ, সময় মতো অফিসে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু গাড়িচালক, হেলপার এরা কেউ নারীদের জরুরী বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেন না। নারী যাত্রী দেখলেই বলেন, ‘সিট নাই, মহিলা যাত্রী তোলা যাবে না...’
 
নারী যাত্রী গাড়িতে তুলতে অনীহার কারণ জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর মৈত্রী বাসের হেলপার সুমন বলেন, ‘সকালে সবার তাড়া থাকে, মহিলা যাত্রীরা গাড়িতে উঠতে ও নামতে সময় নেয় বেশি। তাছাড়া, মহিলারা দাঁড়িয়ে যেতে পারে না। একজন মহিলা যাত্রী যে জায়গায় দাঁড়াতে পারে সেই জায়গায় তিনজন পুরুষ চাপাচাপি করে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এসব কারণে সকালের দিকে মহিলা যাত্রী নিতে চাই না। তাছাড়া ওস্তাদেরও নিষেধ থাকে।’ 

গোপা মুখার্জি নামে এক নারীযাত্রী বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠতে পারলেও একটি আসন পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি বলেন, এখন বাসে ৯টি আসন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত থাকায়, পুরুষরা মনে করেন কেবল ওই ৯টি আসনই নারীদের জন্য বরাদ্দ; বাকিগুলো পুরুষদের জন্য। বাসে ভিড় থাকলে হেলপার বলেন, ‘আপা মহিলা সিট নাই। মহিলা নেয়া যাইবো না’ ইত্যাদি। আমাদের দেশের পুরুষদের চিন্তা, চাকরি করে কেবল পুরুষরা। আর মেয়েরা শখের বসে বেড়াতেই শুধু গাড়িতে ওঠে। যার কারণে একজন পুরুষ যাত্রীর প্রয়োজনীয়তার কথা আমলে নিলেও; মেয়েরাও যে কাজে বের হয় সেটা তারা মানতে চান না। ’

আরেক যাত্রী সাজিয়া পারভীন বলেন, ‘আজকাল খুব কম নারীই ঘরে বসে থাকেন। প্রয়োজনেই ঘরে-বাইরে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু তারা স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছেন না। যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রাজধানীর কর্মব্যস্ত নারীদের এই ভোগান্তি প্রতিদিনের।

এদিকে নারীদের ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি ১৯৯০ সালে প্রথম ঢাকা শহরে দুটি রুটে মহিলা বাস সার্ভিস চালু করে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হওয়ায় মাত্র ৮ মাস পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে তা চালু হয়। বর্তমানে তালতলা, গুলিস্তান, মতিঝিল রুটে দুইটি, রায়েরবাগ, গুলিস্তান মতিঝিল রুটে একটি, মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টর থেকে ইডেন কলেজ হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত ৪টি বাস এবং পাগলা থেকে গুলিস্থান হয়ে মতিঝিলে একটি বাস চলছে। এই বাসগুলো দিনে দুই শিফটে চলাচল করে।

কিন্তু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাসে চলাচল না করে সাধারণ বাসে কেন চলাচল করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে নারী যাত্রী শান্তা ইসলাম বলেন, ‘শুনেছি নারীদের জন্য পৃথক বাস আছে, কিন্তু চোখে কখনো দেখিনি। তাছাড়া শুনেছি সব বাস সময় মেনে আসা-যাওয়া করে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (বিআরটিসি) এর চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানীর ১৪টি রুটে মোট ১৪টি বাস নারীদের জন্য চালু রয়েছে। আমরা অনেক লোকসান দিয়েও নারীদের সুবিধার কথা ভেবে এই বাসগুলো চালু রেখেছি। কিন্তু আশানুরূপভাবে ওইসব গাড়িতে নারী যাত্রী উঠতে দেখা যায় না।