‘সংশোধিত দুদক আইন দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবচ’

 
 
 
 
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতির বিধান বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পেয়েছে। এ রায়ে বলা হয়েছে—দেখা গেল, কোনো একটি দুর্নীতির ঘটনায় সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের সঙ্গে সরকারি কর্মচারী জড়িত। এ অবস্থায় সরকার প্রধান কিংবা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে কিন্তু সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে অনুমতি লাগবে। সরকার প্রধান কিংবা মন্ত্রী মামলার মুখোমুখি হবেন। এই পরিস্থিতির সমন্বয় কী ভাবে ঘটানো হবে, তার কোনো দিক-নির্দেশনা সংশোধিত দুদক আইনে নেই। ফলে আইনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা অযৌক্তিক। রায়ে বলা হয়—কার্যত এটা কোনো আইনই নয়। সংশোধিত এ আইন দেশের সাধারণ মানুষ এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে। দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবচ হবে, যা অসাংবিধানিক—এমন আইন দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক ছাড়া আর কিছুই নয়।
২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন বিল পাস করা হয়। আড়াই বছর পর পাস হওয়া এই বিলে নতুন করে ৩২(ক) ধারা অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়—জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা আবশ্যিকভাবে পালন করতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারায় বলা আছে—জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তা কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না। কোনো আদালতে এই মামলার বিচার হবে, তা সরকার নির্ধারণ করে দেবে। ওই বছরের ২০ নভেম্বর এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এর ফলে কমিশন সরকারের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করতে পারবে না।
দুদক আইনের ৩২(ক) ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ ২০১৩ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন। ওই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে। রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেনের ডিভিশন বেঞ্চ দুদক আইনের ৩২(ক) ধারাকে বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে রায় দেয়। গত সপ্তাহে এই রায়ের অনুলিপি প্রকাশ পেয়েছে।
প্রকাশিত রায়ে বলা হয়েছে—সংবিধান অনুযায়ী একটি বিশেষ শ্রেণিকে দুর্নীতি মামলায় বিশেষ সুবিধা দেয়ার সুযোগ নেই। রায়ে সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ তুলে ধরে বলা হয়—সংশোধিত দুদক আইনের ৩২(ক) ধারা অবৈধ ও বাতিলযোগ্য। কারণ, সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’
এ ছাড়া, সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধিত দুদক আইন অবৈধ ও বাতিলযোগ্য। রায়ে বলা হয়— সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযৌক্তিক আইন প্রকৃতপক্ষে কোনো আইন হতে পারে না। কারণ, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান অধিকার পাবে। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশোধিত আইনে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে দেয়া সমতার নীতির লঙ্ঘন।
রায়ে বলা হয়—২০০৪ সালে প্রণীত দুদক আইনের ১৭(১) ধারায় অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন নেওয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়। ওই আইনে কমিশনকে তার দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতা দেয়া হয়। কিন্তু সংশোধিত আইনের ৩২(ক) ধারা কমিশনের এই স্বাধীনতাকে এবং ২০০৪ সালে প্রণীত আইনের উদ্দেশ্যকে খর্ব করে।