সিটি নির্বাচনে সেনা, সিদ্ধান্ত শিগগির

আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চারদিনের জন্য সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত  নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোটের দু’দিন আগ থেকে (২৬ এপ্রিল) মোতায়েন হয়ে ভোটের পরের দিন (২৯ এপ্রিল) পর্যন্ত সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

 
গতকাল বিকালে কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন আভাস পাওয়া গেছে।। যদিও এর আগে সকালে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকে পুলিশ প্রধান বলেন, আমাদের হাতে পর্যাপ্ত ফোর্স আছে যা দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। আর র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। জবাবে সিইসি বলেন, আমাদের পর্যাপ্ত ফোর্সের চেয়ে প্রয়োজন কার্যকর ফোর্স। সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন আছে-কিনা সে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। ওই বৈঠকের পর কমিশনের বৈঠকে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আজ-কালের মধ্যে সেনা মোতায়েনের জন্য সশস্ত্রবাহিনী বিভাগকে চিঠি দেবে ইসি।
 
কমিশন সিদ্ধান্ত নিলেও সেনা মোতায়েন আদৌ হবে কি-না তা নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের উপর। এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েন চেয়েছিল বিগত নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সরকার সে সিদ্ধান্ত মান্য করেনি। সেনা মোতায়েন নিয়ে রাজনৈতিক মাঠও বিভক্ত। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা সেনা মোতায়েনের দাবি জানালেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত সহস  নাগরিক কমিটি সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে। সুজনসহ কয়েকটি সংগঠন সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনা মোতায়েন চেয়েছে।
 
সকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সভায় সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত রয়েছে।
 
বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনে সর্বোচ্চ সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এজন্য সব বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। কারণ ঝড়ের আগে পরিস্থিতি থমথমে কি-না তা বলা কঠিন। এ জন্য নিরাপত্তার বিষয়ে কোন প্রকার ঝুঁকি নেয়া হবে না। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেউ বল প্রয়োগ করলে দ্বিগুণ বল প্রয়োগ করা হবে।
 
ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে গুলি
 
বৈঠকে সিইসি নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে তিন সিটি নির্বাচন সম্পন্ন করার ব্যাপারে সকলকে কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের তাগিদ দেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসার কিংবা পোলিং অফিসারের কাছে অস্ত্র থাকে না। অস্ত্র থাকবে পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। তাই কেউ ব্যালট বাক্স ছিনতাই কিংবা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করলে সরাসরি গুলি চালাবেন। কারণ অস্ত্র দেয়া হয়েছে পকেটে রাখার জন্য নয়, ব্যবহার করার জন্য। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়লে পার পাবেন না। যে কোন মূল্যে নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে হবে। কারণ তিন সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হোক দেশের জনগণ চায়, আমরাও তাই চাই।
 
অন্য নির্বাচন কমিশনাররা বলেন, ভোটের মালামাল ছিনতাই হয় অথচ গুলি ফোটে না। এটা ঠিক নয়। ব্যালট ছিনতাইকারীদের কোমরের নিচে গুলি করতে হবে। শরীর থেকে রক্ত বের হতে হবে। ভোট কেন্দ্রের আশেপাশে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। ভোট কেন্দ্রের বাইরে গোলযোগ হলে দুর্নাম হয়, তাই ভোট কেন্দ্রের পাশাপাশি ভোটকক্ষগুলো কঠোর তদারকি করতে হবে। এছাড়া নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলা হয়।
 
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারণাকে আচরণবিধি লংঘন বলে উল্লেখ করলেও সিইসি কোন মন্তব্য করেননি। কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতি দুই কেন্দ্রে একটি করে র্যাবের টিম রাখার প্রস্তাব করার বিষয়ে পুলিশ প্রধান বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রে আমাদের দু’টি করে টহল টিম দেয়ার সক্ষমতা আছে।
 
তিন সিটির রিটার্নিং অফিসাররা বৈঠকে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। সবাই নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রয়েছে বলে কমিশনকে জানিয়েছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের মধ্যে কাজে কোন ধরনের সমন্বয়হীনতা নেই বলে জানান তারা। তবে, এ নির্বাচন উপলক্ষে সব বাহিনী প্রধানই বলেছেন, তাদের বাহিনী পর্যাপ্ত রয়েছে। তারা এ নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারবেন।
 
বৈঠক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, সেনা মোতায়নের প্রয়োজন নেই বলে বৈঠকে অনেকে মত দিয়েছেন। নির্বাচনে জ্বালাও-পোড়াও এবং পেট্রোলবোমা বন্ধ করা গেলে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব হবে।
 
শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী, মো. শাহনেওয়াজ, সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু বেলাল মো. সফিউল হক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ, ইসি সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার এবং তিন সিটির রিটার্নিং অফিসারগণ এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
 
সিইসির ব্রিফিং
 
বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আমরা সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছি। শুধু প্রার্থীদের কথা নয়, ভোটারদের কথাও চিন্তা করা হচ্ছে। সবাই যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আবার বাড়িতে ফিরতে পারেন তা নিশ্চিত করা হবে। কেউ কোন চান্স নিতে চাইলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 

বেগম খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিইসি বলেন,  আচরণবিধিতে বাংলায় স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার ও তাদের সমমর্যাদার সুবিধাভোগী কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। যারা বিধির আওতায় পড়বেন-তারা প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। যারা আওতায় পড়বেন না, তারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন।