শনিবার মধ্যরাতে দেশের বিভিন্ন জেলায় শক্তিশালী কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হেনেছে। এই ঝড়ের ছোবলে কমপক্ষে ১৩ জন নিহত এবং শতাধিক লোক আহত হয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার কাঁচা ও পাকা ঘর গাছপালা উপড়ে গেছে। সবচে’ বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জে। বিভিন্ন জেলা থেকে ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: শনিবার রাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবল ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ের সময় গাছচাপা পড়ে ও সিএনজি অটোরিকশা উল্টে ৫ জন নিহত, অর্ধশতাধিক আহত এবং সহস্রাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়। অধিক ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে পাকুন্দিয়া, বাজিতপুর, কটিয়াদী ও কুলিয়ারচর। ঘরের ভিতর গাছ চাপা পড়ে মারা যান পাকুন্দিয়া উপজেলার কাজীহাটি গ্রামের হযরত আলী (৩৫) ও তার পুত্র রিজন (৭)। কটিয়াদী উপজেলার চর আলগী গ্রামের আ. মান্নান (৬০) ও বাজিতপুর উপজেলার তাতালচর গ্রামের স্কুলছাত্রী রীনা আক্তার (১২) গাছ চাপা পড়ে মারা যান। এদিকে ঝড়ের কবলে পড়ে সিএনজি চালিত অটোরিকশা উল্টে মারা যান কুলিয়ারচর উপজেলার টিয়াকাটা গ্রামের মত্স্যব্যবসায়ী শীতল বর্মণ (৩২)। ডুমরাকান্দা বাজার থেকে কুলিয়ারচর ফেরার পথে ভিটিগাঁও নামক স্থানে অটোরিকশাটি ঝড়ের কবলে পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। ঝড়ে উঠতি বোরা ধানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানায়।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: ময়মনসিংহে কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ চাপায় ২ জন ও বজ্রপাতে ১ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৫ জন। এছাড়া ফসল ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, শনিবার রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধা কানাই বাজারে দোকানে বটগাছ চাপায় আব্দুল করিম নামে এক কৃষক নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছে। এদিকে একই সময়ে মুক্তাগাছার সন্তোষপুরে গাছ চাপায় জালাল উদ্দিন ভুট্টো নামে এক যুবক মারা যায় এবং আহত হয় ১০ জন। আহতদের ময়মনসিংহ মেডিক্যালসহ স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ঝড়ের সময় বজ পাতে ত্রিশালের বালিপাড়া গ্রামে ইলিয়াস আলী নামে অপরজন মারা যায়। কালবৈশাখী ঝড়ে ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, পোলট্রি মুরগি, গাছপালাসহ বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা: কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ওপর দিয়ে শনিবার রাতে ২ দফায় কালবৈশাখী ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে ঘরের নিচে চাপা পড়ে উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজিরচর গ্রামের আ:মান্নান নিহত হয়। এছাড়া একই গ্রামের জাহাঙ্গীর (১৮) নামের এক ব্যক্তি আহত হয়।
শনিবার সন্ধ্যায় ও গভীর রাতে ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে উপজেলার কটিয়াদী পৌর সদর, মসূয়া, জালালপুর, লোহাজুরী, আচমিতা, চান্দপুর, করগাঁও ও ধূলদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ৫ শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এছাড়া সহস াধিক গাছপালা উপড়ে পড়ে।
ফুলবাড়ীয়া (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা: শনিবার রাতে কালবৈশাখী ঝড়ে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার রাধাকানাই বাজারে বট গাছ উপড়ে ঘর চাপায় আ. করিম (৪০) নামের ১ জন নিহত হয়েছেন। এসময় ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরীসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন।
শতবর্ষী বট গাছটি ঝড়ে উল্টে গেলে ৬/৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গাছপালা কাঁচা ঘরবাড়ি বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা: মুক্তাগাছায় কালবৈশাখী ঝড়ে গাছ চাপায় জালাল আহমেদ ভুট্টু (২৯) নামে এক যুককের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার রাতে ঝড়ে উপজেলার খেরুয়াজানি ইউনিয়নের সন্তোষপুর গ্রামে ঘরে অবস্থানকালে গাছ চাপা পড়ে ঐ যুবক মারা যায়। উপজেলায় ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার উঠতি ফসল, বাড়ি-ঘরের চাল, গাছপালা উপড়ে গেছে। শনিবার রাত ১১টা থেকে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উপজেলায় বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা: শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় বাজিতপুর পৌর এলাকাসহ আশপাশের বৃহত্তর এলাকায় প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যায়। এতে উপজেলার গাজিরচর ইউনিয়নের তাতালচর গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রিমা আক্তার (১০) মারা যায়। রিমা ঘাগটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলো। তার বাবা হান্নান মিয়া দীর্ঘদিন যাবত্ রিয়াদ প্রবাসী।
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা: ময়মনসিংহের ত্রিশালে ৭টি ইউনিয়নের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসময় বালিপাড়া ইউনয়নের চর মাধাখালী গ্রামের ইলিয়াস নামে এক ব্যক্তি বজ্রপাতে মারা যান ও ৩২ জন আহত হয়। আহতদের ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি: নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বৈরাটি এবং নারানদিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে গত শনিবার সন্ধ্যায় প্রবাহিত কালবৈশাখী ঝড় এবং সেই সাথে প্রচণ্ড শীলাপাতের কারণে ২৭টি গ্রামের হাজার হাজার হেক্টর জমির উঠতি পাকা বোরো ধান একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। মাটিতে মিশে গেছে ধানের গাছ। আর ১০/১২ দিন পর এই ধান ঘরে তোলার কথা ছিল কৃষকদের।
ভাঙ্গুড়া (পাবনা) সংবাদদাতা: শনিবার সন্ধ্যায় শিলাবৃষ্টিতে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় আম-লিচু ও বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে ভাঙ্গুড়া ও পারভাঙ্গুড়া ইউনিয়নে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এ দুটি ইউনিয়নে প্রায় ৩শ হেক্টর জমিতে ২৯ জাতের বোরো ধানের থোর ও ব্রি-ধান-২৮ জাতের আধাপাকা শীষ নষ্ট হয়ে গেছে।
বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা: পাবনার বেড়ায় শনিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। এসময় শিলাবৃষ্টির ফলে বোরো ধান, আম, লিচু, পেঁয়াজ, তরমুজসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বেড়া কৃষি বিভাগ জানায়, তাত্ক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়নি।
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা: গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে কালবৈশাখী ঝড়ে ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও বিদ্যুত্ খুঁটি, গাছপালা ভেঙ্গে যাওয়াসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ঘর ও গাছের নিচে চাপা পড়ে ১০ জন আহত হয়েছে।
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা: পাবনার চাটমোহরে শনিবার আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ২০ মিনিট স্থায়ী বৃষ্টির সাথে শিলা বর্ষণের ঘটনা ঘটে। সাথে ছিল ঝড়ো হাওয়া। ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে আগাম বোরো ধান, আম, লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা: সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে প্রবল শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ে ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে- শনিবার রাতে ২ দফা প্রবল শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান, ভুট্টা, সবজি, আম, কাঁঠাল, পেঁপে ও অন্যান্য ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ব্রহ্মগাছা, চান্দাইকোনা ও ধানগড়া ইউনিয়ন এলাকার মাঠ ও বাগানের ফল ও ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
চলনবিল (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা: মধ্যরাতে ঝড়ে ও শিলাবৃষ্টির তাণ্ডবে তাড়াশসহ চলনবিলের বিভিন্ন ইউনিয়নের বাড়িঘর ও উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের কবলে পল্লী বিদ্যুতের তাড়াশ উপজেলাতেই ৪০টি খুঁটি হেলে যাওয়ায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা: ছাতকে প্রচণ্ড ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ফসল ও কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। শনিবার রাতে প্রায় আধঘন্টা ব্যাপী ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধস্ত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের হাওরে পাকা বোরো ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে শিলা বৃষ্টিতে।
গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা:ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের ওপর দিয়ে শনিবার বিকাল ও মধ্যরাতে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর আঘাত ও শিলাবৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে উড়ে আসা গাছপালা ও টিনের আঘাতে অন্তত ৪০জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঝড় শুরুর পর উপজেলায় বিদ্যুত্ সরবারহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঝড়ে ঘরহারা সহস াধিক মানুষ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি:গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড়ে শনিবার রাতে ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও অসংখ্য গাছপালা ভেঙ্গে গেছে এবং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানসহ রবি ফসলের। ঘরের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়েছে অন্তত: ১০ জন। এছাড়া বেশকিছু বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় শনিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা শনিবার রাতে কালবৈশাখীতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন।