২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভবন ধসের পর দুই বছরেও রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত ১৫ এপ্রিল অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু ও ইমারত নির্মাণ আইনে দায়ের করা দুটি মামলার চার্জশিট দাখিল করার নির্ধারিত সময় ছিল। কিন্তু সিআইডি চার্জশিট দাখিল করতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত ২১ মে দিন ধার্য করেছে। এই দুই মামলায় প্রধান আসামী সোহেল রানাসহ ১২ জন কারাগারে রয়েছেন। পৌর মেয়র রেফায়েত উল্লাহসহ ১১ জন জামিনে আছেন।
এদিকে হাইকোর্ট এক আদেশে এই দুই মামলার সর্বশেষ অবস্থা প্রতিবেদন আকারে আদালতে দাখিল করতে বলেছে। আগামী রবিবার এই প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা ও সাভার থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মামলা দুটির তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর বলেন, পুলিশের দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় ৪২ জনকে ও রাজউকের ইমারত আইনের মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট তৈরির প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। আদালতের নিদের্শ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে চার্জশিট প্রদান করা হবে।
সিআইডি’র মামলা তদন্তকারী একজন কর্মকর্তা জানান, দুই মামলায় ৫৯ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল আহম্মেদ বাদী হয়ে ইমারত আইনে দায়ের করা মামলায় ১৭ জনকে আসামী করা হচ্ছে। ১৭ জনের মধ্যে সরকারের চারটি প্রতিষ্ঠানের ১৩ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। এই ১৩ জন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করার অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতর প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠায় সিআইডি। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে শ্রম মন্ত্রণালয়, রাজউক, স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চিঠির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তাই তদন্তের কাজ শেষ হলেও ঐ চিঠির জবাব না পাওয়ায় চার্জশিট দিতে পারছে না সিআইডি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঐ কর্মকর্তা জানান, দায়িত্বে অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তারা হচ্ছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সাভারের পৌর মেয়র রেফায়েত উল্লাহ, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খান, উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম রাসেল, সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম। এদের মধ্যে পৌর মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর এই মামলায় জামিনে রয়েছেন। বাকিরা কারাগারে। শুধু ফারজানা ইসলাম বিদেশে ছুটিতে আছেন। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত কল-কারখানা অধিদফতরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক বেলায়েত হোসেন ও মাহমুদ জামশেদুর রহমান এবং উপ-মহাপরির্শদক শহিদুল ইসলাম ও ইউসুফ আলী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সাভারের সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কবির হোসেন সরকার, সাভার পৌরসভার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় ও রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) সাভার উপজেলার সাবেক ইমারত পরিদর্শক আওলাদ হোসেন এই মামলার আসামি। তবে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রানা প্লাজা নির্মাণে নিম্নমানের ইট-সুরকি ব্যবহার করায় ভিত অনেক দুর্বল ছিল। তাছাড়া ছয়তলা বাণিজ্যিক ভবন তৈরির অনুমোদন নিয়ে তা নয়তলা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে ঐ নয়তলা বাণিজ্যিক ভবনটিতে গার্মেন্টস স্থাপন করা হয়। এতে দুর্বল কাঠামোকে আরো দুর্বল করে দেয়। ঘটনার আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ভবন ও পোশাক মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।
ভবন ধসের পর সাভার থানায় এসআই ওয়ালী আশরাফ খান বাদী হয়ে ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল দণ্ডবিধি ৩০৪ (ক) (অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু) ধারায় দায়ের করা মামলায় ৪২ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট প্রদানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। প্রধান অভিযুক্তরা হচ্ছেন— রানা প্লাজার মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা ও তার বাবা আবদুল খালেক কুলু, সাভার পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহ, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খান এবং ঐ ভবনের পোশাক কারখানার পাঁচ মালিক আমিনুল ইসলাম, বজলুল সামাদ আদনান, মাহমুদুর রহমান তাপস, ডেভিড মেয়র রেকো ও আনিছুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান। এছাড়া রানার আশ্রয়দাতা আবুল হাসান, সহযোগী শাহ আলম মিঠু, অনিল কুমার ও হাসানসহ ৪৯ জন।
এই মামলায় আব্দুল খালেক কুলু, রেফায়েত উল্লাহ, মোহাম্মদ আলী খান, মাহমুদুর রহমান তাপস, আনিসুজ্জামান, আবুল হাসান, অনিল কুমার দাস, শাহ আলম মিঠু, এনায়েত হোসেন, রাকিবুল ইসলাম ও আলম মিয়া জামিনে রয়েছেন। সোহেল রানা, বজলুল সামাদ আদনান, আমিনুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক খান, আলমগীর, রাসেল মধু ও সরোয়ার কারাগারে রয়েছেন।
ভবন ধসের ঘটনায় সরকারি হিসাবে ১১৩৪ জন নিহত, প্রায় ২ হাজার ব্যক্তি পঙ্গু হয় এবং অনেককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশনা : রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা দিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা মামলাসমূহের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে আগামী রবিবার আদালতকে জানাতে সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাভার থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের করা রিট ও স্বপ্রণোদিত হয়ে হাইকোর্টের দেয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের শুনানিকালে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি আব্দুর রবের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার দুপুরে এ আদেশ দেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ড. কামাল হোসেন। এছাড়া ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্লাস্টের পক্ষে এ্যাডভোকেট বরকত আলী, রাজউকের পক্ষে এ্যাডভোকেট কেএম সাইফুদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আল আমিন।