ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সবাই এখনও ঠিকভাবে ক্ষতিপূরণ পাননি। অথচ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সংগৃহীত ১২৭ কোটি টাকার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৯ কোটি টাকা। বাকি ১০৮ কোটি টাকাই অব্যবহূত রয়ে গেছে। অথচ এ পুরো টাকাই ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাপ্য। এছাড়া রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের সহায়তার উদ্দেশ্যে গঠিত ‘ডোনার্স ট্রাস্ট ফান্ড’র টাকা কিভাবে আসছে, কিভাবে ব্যয় হচ্ছে এর কোন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই এই ট্রাস্ট ফান্ডের কার্যক্রম নিয়ে অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা কমিয়ে আনার কথাও শোনা যাচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ত্রাণের অর্থ দিয়েই ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বের অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের সবার মধ্যে আত্মসমালোচনা থাকতে হবে।
গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থার কার্যালয়ে টিআইবি আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় ‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গৃহীত পদক্ষেপ: এক বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন নাজমুল হুদা মিনা। উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক খাতের সুশাসন রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপের প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। গত এক বছরে ৮০টি উদ্যোগের মধ্যে ২০টি স্থবির হয়ে রয়েছে। ১২টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন হচ্ছে খুব ধীরগতিতে। ফলে কারখানাগুলোতে শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও চাকরিকালীন নিরাপত্তা এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছায়নি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার দুই বছর পরও অনেক পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি। রানা প্লাজা ও তাজরীনের ঘটনায় অভিযুক্তরা যথাযথ জবাবদিহিতার মুখোমুখি হচ্ছে না। ফলে এ ধরনের ঘটনা বার বার ঘটছে। এদিকে ৯৫ শতাংশ পোশাক কারখানায় ন্যূনতম মজুরি দেয়া হলেও সময়মত তা দেয়া হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকরা ঋণের জালে আটকে যাচ্ছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাক কারখানায় সুশাসন নিশ্চিত করতে ২০১৪-১৫ সালে চলমান উদ্যোগগুলোর মধ্যে ১৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ৪৫ শতাংশ প্রত্যাশিত গতিতে চলছে। ১৫ শতাংশ ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে। আর ২৫ শতাংশ উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছে। রানা প্লাজা ‘ডোনার্স ট্রাস্ট ফান্ডে’ প্রস্তাবিত ৩০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ২১ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। তবে কারা কারা ক্ষতিপূরণ পেল তা প্রকাশ করা হয়নি। কারা এখনও পায়নি তাও প্রকাশ করা হয়নি। শ্রমিক অধিকার রক্ষায় শ্রম পরিদপ্তরের হটলাইন স্থাপনের উদ্যোগ এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। কারখানায় অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৬৭ শতাংশ কারখানায় জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স ও বুয়েট কর্তৃক জরিপকৃত কারখানার সংস্কার কার্যক্রম পরীবিক্ষণের জন্য দুটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তবে কারখানা জরিপের সময় কোন কোন বায়ার কারখানা বন্ধের আদেশ দেয়াসহ অতিরিক্ত কঠোর আচরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক বছরে কমপ্লায়েন্স ঘাটতির অজুহাতে ২২০টি মাঝারি ও ক্ষুদ্র আকারের কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, গত এক বছরে কোন কোন কারখানায় অতিরিক্ত এক ঘণ্টা করে মজুরি ছাড়া কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের সাথে জড়িত শ্রমিকদের হয়রানি, মামলা বা চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানায় মজুরি বোর্ড নির্ধারিত মজুরি দেয়া হচ্ছে না। এদিকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিভিন্ন অজুহাতে সরকারের কাছ থেকে বিজিএমইএর অতিরিক্ত সুবিধা আদায় অব্যাহত রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ৯৫ শতাংশ কারখানায় বাস্তবায়ন হলেও এ মজুরি জীবনযাত্রার মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শ্রমিক ইউনিয়নের হার বেড়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। তবে দুর্ঘটনা পরবর্তী বিভিন্ন আইন করা হলেও আইনের অপব্যবহার করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। তাছাড়া পোশাক খাত দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও এ খাতের কাজে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।
পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে টিআইবির পক্ষ থেকে দশটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সরকার ও বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে পাবলিক সেক্টর বোর্ড গঠন, ক্ষুদ্র কারখানার কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে তহবিল গঠন, রানা প্লাজা ও তাজরীনের ঘটনায় দায়ের করা মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তদের তালিকা ও প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রকাশ উল্লেখযোগ্য।