নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৮ এপ্রিল, ২০১৫ ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন যাবত্ ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন অনির্বাচিত প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত হলেও এবার নগরবাসীর নির্বাচিত মেয়রের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। সেজন্যে নির্বাচন কমিশনকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
চারদিকে পুরোদমে চলছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা। পুরো নগরী জুড়ে উত্সবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। সবার লক্ষ্য ২৮ এপ্রিলের দিকে। ঐদিন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে কারা হতে যাচ্ছেন নগরবাসীর অভিভাবক, নির্বাচিত নগর পিতা।
তবে আইন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার কথা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রার্থী নির্বাচনের কোন সুযোগ নেই। যোগ্যতার ভিত্তিতে যেকোন প্রার্থীই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোন ধরনের দলীয় হস্তক্ষেপ কাম্য হতে পারে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য নির্বাচন কমিশন কতিপয় বিধান প্রণয়ন করে। ২০১০ সালে প্রণীত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আচরণ বিধিমালার ২ (ঙ) ধারা অনুযায়ী, “নির্বাচনী প্রচারণায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ব্যতীত কোন রাজনৈতিক দলের নাম বা প্রতীক বা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম বা ছবি ছাপাইতে বা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।”
এ বিধান থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন একটি নির্দলীয় নির্বাচন।
কিন্তু আইনের সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই। বাস্তবে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি। আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার কোনো ধরনের সুযোগ না থাকলেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় প্রার্থী নির্ধারণ করে থাকে। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। অর্থাত্ এ নির্বাচনের সব কিছুই হচ্ছে দলীয়ভাবে। নির্দলীয় নির্বাচনকে সম্পূর্ণ দলীয়ভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এবং কিছু ছোট দল দলীয় বিবেচনায় তাদের প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচার-প্রচারণাসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নিজ নিজ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। দল মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনাও দিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন নিজেরাও নানাভাবে সরাসরি প্রচারণায় অংশগ্রহণ করছেন।
শুধু মেয়র পদেই নয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী প্রার্থীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে । এমনকি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা প্রার্থী হবেন তাদের দল থেকে বহিষ্কার এবং দলীয় পদ-পদবী থেকে অব্যাহতি দেয়ার হুমকি-ধমকিও দেয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের বিধিতে নির্দলীয় নির্বাচন বলে উল্লেখ করা হলেও সিটি নির্বাচন এখন আর নির্দলীয় নেই। এটি জাতীয় নির্বাচনের মতো সম্পূর্ণরূপে একটি দলীয় নির্বাচনে পরিণত হয়েছে। শুধু প্রার্থীরা নির্বাচনে তাদের দলীয় প্রতীক ব্যবহার করছেন না। এ ছাড়া আর সবকিছুই হচ্ছে দলীয় নির্বাচনের মতোই।
তাই স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমানে যেভাবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেটি নির্বাচনী আচরণ বিধির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। দলীয়ভাবেই যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে হয় তবে নির্বাচনী আইনে সংশোধনী আনাই ভালো।
নির্বাচন কমিশনের সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘনের পরও যদি কারো বিরুদ্ধে কোন ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তবে একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, অন্যদিকে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা কমে যাবে।
তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিনীত অনুরোধ থাকবে, হয় নির্বাচনী আচরণ বিধি সংশোধন করে স্থানীয় সরকার তথা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে দলীয় নির্বাচন বলে স্বীকৃতি দিন, অন্যথায় যারাই বিদ্যমান আচরণ বিধি লঙ্ঘন করছেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।