২০১৩ সালের শেষের দিকে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কল্যাণের জন্য নানা কাজে জড়িত মাকসুদুর রহমান হঠাত্ কিছু শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেদের নিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ ক্যারাম ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সালামের কাছে।
মাকসুদ জানান এসব ছেলেরা ক্রিকেট খেলে এবং একটি দল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আগে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে আব্দুস সালামের। প্রতিবন্ধী ছেলেরা তাদের আগ্রহের কথা জানালেন।
তাদের আগ্রহ দেখে আব্দুস সালাম আর ‘না’ করতে পারেননি। তার পরিচিত নানা জনকে একসাথে করে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড’। এর সভাপতি করা হলো অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুস সালামকে। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক হলেন ইঞ্জিনিয়ার মো. মাকসুদুর রহমান, দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো এ কে এম জসিম উদ্দিনকে। কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক ভবন ও কাগজপত্র ছাড়াই কাজ শুরু করলেন সবাই।
পরিচিতদের মধ্যে খুঁজে ২৫-৩০ জন মোটামুটি ভালো ক্রিকেটার পাওয়া গেল। প্রথম টার্গেট ছিল অন্য কোনো দলের সাথে ক্রিকেট খেলে নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করা। প্রথম সুযোগ এলো ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের ছেলেদের নিয়ে গঠিত একটি দলের সাথে খেলার মধ্য দিয়ে।
প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলটি ভারতের সাথে তাজমহল ট্রফি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেল। কিন্তু ভারতে যাওয়ার জন্য সেরকম কোনো অর্থ ছিল না। পরে জনতা ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ভারতে গিয়ে ভারতের শারীরিক প্রতিবন্ধী দলটিকে হারিয়ে দেয় বাংলাদেশ দল। ভারতের অভিজ্ঞ এই দলকে হারিয়ে তাজমহল ট্রফি অর্জন ছিল সত্যিই এক বড় অর্জন। বাংলাদেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তার হাতে ট্রফিটি তুলে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন দলটি।
প্রধানমন্ত্রী শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের এই দলকে আরও শক্তিশালী করে গঠনের জন্য এক কোটি টাকা অনুদান এবং অনুশীলনের জন্য বঙ্গভবনের পাশে ফাঁকা জায়গায় মাঠসহ, সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য মিরপুরে একটি অফিস দেওয়ার ঘোষণা দেন। এছাড়া বিজয়ী দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকার চেক প্রদান করেন।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই দলকে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের তালিকাভুক্ত আড়াইশো ক্রিকেট খেলোয়াড় রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক মো. মোহসিন জানালেন, তাদের জন্য চলাফেরা করাই কষ্টকর, কিন্তু তারা নিজেদেরকে দুর্বল ভাবেননি। হুইল চেয়ারে বসে চলাফেরা করলেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে দক্ষ হিসেবে।
তার পাশাপাশি অন্যদের কারো হাতে সমস্যা, অনেকের অন্য কোনো অঙ্গে সমস্যা। যারা দৌড়াতে পারেন না তাদের রান সংগ্রহের জন্য অবশ্য রানার থাকেন। প্রতিবন্ধীরা যাতে সমাজের মূলধারার মানুষের মাঝে আসতে পারে, তাদেরকে যাতে নির্বাসিত হয়ে জীবন কাটাতে না হয় সেই অনুপ্রেরণা তৈরির উদ্দেশ্যেই তারা বিভিন্ন ধরনের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন বলে জানালেন তিনি। দলের বর্তমান অধিনায়ক সুমিত জানান, একজন প্রতিবন্ধী যখন দেশের বাইরে জাতীয় পতাকা তুলে ধরেন, তখন দেশের অসংখ্য প্রতিবন্ধী মানুষ এবং তাদের পরিবারগুলো সংকোচ থেকে মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
এভাবেই একদিন আসবে, যারা শারীরিক প্রতিবন্ধী আছে তারা আর কখনো কোনো বঞ্চনার শিকার হবে না, তাদেরকে কখনো ছোট করে দেখা হবে না। সরকার থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে তারা তাদের খেলার সরঞ্জাম কিনেছেন বলে জানালেন। এছাড়া সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া টাকা দিয়েও তারা ক্রিকেট সরঞ্জাম কেনা, অফিস ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক মাসিক খরচ চালানোর চেষ্টা করেন বলে জানালেন তারা। তাছাড়াও ঢাকার বাইরে থেকে আগত খেলোয়াড়দের খরচও বহন করা হয় এই অর্থ থেকেই।
সর্বশেষ সাফল্যের কথা জানাতে গিয়ে তারা জানালেন, ২০১৫ সালে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান—এশিয়ার এই পাঁচটি দেশের ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দলগুলোকে নিয়ে এশিয়া কাপ আয়োজন করা হয়। নতুন দল হয়েও এই টুর্নামেন্টে ভারতকে হারায় বাংলাদেশ দল। বিসিএপিসি’র অন্যান্য শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররা জানান, বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত ও পাকিস্তানের ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দলগুলো তাদের জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নিজেদের ভালোভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে।
একইভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকেও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তারা। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ফেসবুকে ইন্ডিয়ার ক্রিকেট টিমের কথা জেনে, উত্সাহিত হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের নিয়ে ক্রিকেট দল প্রস্তুতের নেশায় মেতে উঠেছিলেন মহসিন। সেই নেশা ও নিরলস চেষ্টায় এই মূল সংগঠক শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের একত্রিত করে এই দল গঠনে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে কোচ এস কে এম জসিমের সহযোগিতায় আজকের এই অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছেন তারা। ভবিষ্যতে অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে দল গঠনের মাধ্যমে ভালো খেলোয়াড় খুঁজে বের করা হবে বলে জানালেন সেক্রেটারি মাকসুদুর রহমান। নিজেদের প্রমাণের মাধ্যমে একদিন এই দলটি জাতীয় দলের মতো সুযোগ-সুবিধা পাবে এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নামকে উজ্জ্বল করবে এমন শুভকামনা রইল তরুণকণ্ঠ-এর পক্ষ থেকে।