নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে ঢুকছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। উদ্দেশ্য নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, অরাজকতা সৃষ্টি করা। একটি গোয়েন্দা সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তার আলামতও দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই পুলিশ ঢাকা থেকে আসা তিন সন্ত্রাসীকে এলজিসহ গ্রেফতার করেছে। এছাড়া প্রতিপক্ষের হামলায় ২ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন।
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৮২ শতাংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যে নগরীর ৭১৯টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৫৯১টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে তারা। ফলে নির্বাচনের দিনে গোলযোগের আশংকা থেকেই যাচ্ছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থগুলোও সে আশংকার কথা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীরা চট্টগ্রামের ইত্তেফাক অফিসে এসে তাদেরকে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। বাধাদানকারীদের বেশিরভাগই অপরিচিত মুখ বলে তারা জানান। তাছাড়া আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীরা নির্বাচনের সুযোগে এলাকায় ফিরে এসে নানা অপতত্পরতায় লিপ্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা ।
এ প্রসঙ্গে মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছিরউদ্দিনকে সমর্থন প্রদানকারী নাগরিক কমিটির কো-চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন বলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি-জামায়াত মৌলবাদী চক্র চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে খবর এসেছে। যদি ফলাফল তাদের অনুকূলে না যায় তাহলে তারা চট্টগ্রামে ব্যাপক তাণ্ডব চালাতে পারে। অপরদিকে নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলার বাইরে থেকে সন্ত্রাসীরা আসছে বলে অভিযোগ করেছেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নগরীতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। গত ১১ এপ্রিল নগরীর বায়েজিদ থানাধীন শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায় মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলমের নির্বাচনী কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় বিএনপি নেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমসহ ১০ জন আহত হন। গত মঙ্গলবার খুলশী থানার পলিটেকনিক এলাকায় এম মনজুর আলমের সমর্থনে বের হওয়া মিছিলেও হামলা হয়। তবে এসব হামলার ঘটনা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কী না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে। নগরীতে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছাত্রলীগ ও যুবদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত দুইজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা দাবি করেছে, দলীয় অন্তর্কোন্দলের কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সম্প্রতি নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এসব আস্তানা থেকে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ২৫ জঙ্গিকে আটক করা হয়েছে। তবে আসন্ন সিটি নির্বাচনে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নেই বলে মনে করছে পুলিশ। এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার (অপরাধ ও অভিযান) ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা আপাতত নেই। কারণ জঙ্গিরা বর্তমানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচনে হামলা করার মত সংগঠিত অবস্থানে তারা নেই।
এদিকে নির্বাচন পূর্ববর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি নিতে মহানগরের ১৬ থানার ওসিকে নিয়ে বৈঠক করেছেন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল জলিল মণ্ডল। বৈঠকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাতে মহানগরে কোন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড না ঘটে এবং জঙ্গি তৎপরতা সংঘটিত না হয় সে ব্যাপারে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটানোর জন্য সন্ত্রাসীদের নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান নেয়া একটা স্বাভাবিক ‘প্যাটার্ন’। এ ব্যাপারে আমরা অবগত আছি এবং প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যাতে মহানগরে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য নগরের প্রবেশমুখে ৬টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এসব চেকপোস্ট থেকে ইতিমধ্যেই অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নগরীতে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলছে। শিবির নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আমরা নির্বাচনের গুরুত্ব বুঝে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছি।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের রিটার্নিং অফিসার মো. আব্দুল বাতেন বলেন, ভোটররা যাতে নির্বাচনে নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারেন সে ব্যাপারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। এ ব্যাপারে আইন-শৃংখলা বাহিনীকে যথাযথ নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ নিয়ে আজ (বুধবার) আইন-শৃংখলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। বৈঠকে নির্বাচনের দিন ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪ জন এবং অন্যান্য কেন্দ্রে ২২ জন আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া এক ব্যাটালিয়ন সেনা সদস্য থাকবে। ২৫ এপ্রিল রাত বারোটার পর থেকে কোন বহিরাগত নগরীতে থাকতে পারবে না।
কেন্দ্রের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বনজ কুমার মজুমদার জানান, নির্বাচনের দিন নগরীতে কয়েক হাজার অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন থাকবে। প্রত্যেকটি কেন্দ্রে ১০জন অস্ত্রধারী পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা থাকবে। কয়েকটি সেন্টার নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে। এছাড়া থানাওয়ারি ফোর্স এবং স্ট্রাইকিং ফোর্সও থাকবে।