কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী বন্ধ মোহিনী মিলের মালিকানায় বার বার হাত বদল হচ্ছে। তবে মিলের মালিকানায় হাত বদল হলেও চালুযোগ্য বিএমআরই (ব্যালেনচিং মর্ডানাইজিং রেনোভেটিং ইঞ্জিনিয়ারিং) অংশ চালু কিংবা মিলের সুবিশাল জায়গায় নতুন ইউনিট চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কিছু সুবিধাভোগী কর্মকর্তা ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশে মালিক পক্ষ মিলের সম্পত্তি এবং পরিত্যক্ত মিলের লোহা-লক্কড় ও পুরাতন মূল্যবান যন্ত্রাংশ বিক্রির অনুমতি লাভের জন্য নানা তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে হাত বদলের পরিক্রমায় সর্বশেষ আরিফুর রহমানের কাছে মিলের মালিকানা হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্টের রায়ে মন্ত্রণালয় আরিফুর রহমানের নামে দেয়া মিলের বরাদ্দপত্রের ওপর রুলনিশি জারি করে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে।
২০০৯ সালের ১০ ডিসেম্বর (প্রাক্তন মোহিনী মিল) বর্তমানে শাহ মখদুম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন লিকুইডেশন সেল এবং খেলাপি ঋণ আদায়কারী প্রতিষ্ঠান দি পিপলস্ ডেভলপমেন্ট সার্ভিসেস করপোরেশন (পিডিএসসি) লিমিটেডের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তির ভিত্তিতে মিলের বিএমআরই অংশ চালু করার জন্য মিলের সাবেক ক্রেতা শাহ মখদুম কর্তৃপক্ষের নিকট মিলটি হস্তান্তর করে। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শাহ মখদুম কর্তৃপক্ষ মিল চালু করতে ব্যর্থ হওয়ায় তৃতীয় পক্ষ হিসাবে মিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় পিডিএসসি কর্তৃপক্ষকে। পিডিএসসি দায়িত্ব গ্রহণের পর মিলের সংস্কার, বকেয়া বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ ও বিদ্যুত্ লাইন পুনঃসংযোগের মাধ্যমে ২০১০ সালের ২১ মে দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত্ বন্ধ মিলের বিএমআরই (ব্যালেনচিং মর্ডানাইজিং রেনোভেটিং ইঞ্জিনিয়ারিং) অংশ চালু করে। প্রাথমিকভাবে মিলে পৌনে তিন’শ শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল এবং মিলে ৩৮ কাউন্ট ও ৪০ কাউন্টের সুতা উত্পাদন শুরু হচ্ছিল। এ ছাড়া মিলের পুরাতন অংশের সকল অকেজো যন্ত্রপাতি ও লোহা-লক্কড় পিডিএসসি কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগকারী হাজী আব্দুল মতিনের কাছে বিক্রি প্রস্তাবের ভিত্তিতে অগ্রণী ব্যাংকের তিন কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করা হয়। মিলের বিএমআরই ইউনিট চালুর পাশাপাশি পুরাতন অংশের জায়গায় নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনের জন্য পিডিএসসি চীনের একটি কোম্পানির সাথে চুক্তি করেছিল। কিন্তু পরে নানা জটিলতা ও চক্রান্তের কারণে প্রায় ২২ বছর চালু থাকার পর বিএমআরই ইউনিটটি বন্ধ ও নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়ে।
এ দিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিএমআরই ইউনিটের মূল্যবান যন্ত্রাংশ নষ্ট ও অকেজো হওয়ার পথে। এদিকে শাহ মখদুম মিলের মালিক ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে পিডিএসসিকে চাপের মুখে ফেলে মিলের মালিকানায় পরিবর্তন আনা হয় এবং ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আরিফুর রহমানের কাছে মন্ত্রণালয় থেকে মিলটি হস্তান্তর করা হয়। গত ২৪ মার্চ হাইকোর্টে রীট পিটিশন হাজী আব্দুল মতিনের দায়ের করা রীট পিটিশনটি শুনানি হয় এবং মন্ত্রণালয় থেকে আরিফুর রহমানের নামে মিল বরাদ্দপত্রের ওপর রুলনিশী জারি করে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ প্রদান করা হয়।
আড়ুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও জাতীয় পার্টির (জেপি) কুষ্টিয়া জেলা কমিটির আহবায়ক রোটারিয়ান জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, মোহিনী মিলের কোনো সম্পত্তি বিক্রি করতে দেয়া হবে না। মিলের বিএমআরই ইউনিট চালু ও পুরাতন জায়গার ওপর নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপনের দাবি জানান তিনি। এই মিল চালু হলে একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অন্যদিকে কুষ্টিয়ার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ আরো মজবুত হবে। ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়া শহরের পূর্ব প্রান্তে মিলপাড়ায় ৩৩ একর জমির ওপর চক্রবর্তী এন্ড সন্স কোম্পানির মালিক মোহিনী মোহন চক্রবর্তী মোহিনী মিল নামে মিলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তত্কালে ব্রিটিশ-ভারতে বিলাতি কাপড় বর্জন করে স্বদেশি কাপড় প্রস্তুত করা ছিল বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ওই সময়ে মিলে গড়ে প্রতিদিন কাপড় উত্পাদন হতো ৫০ থেকে ৫৫ হাজার গজ। এ ছাড়া মিলে উত্পাদিত ধুতি ও শাড়ি সাধারণ মানুষের নিকট ছিল অতি সমাদৃত। মিলে ৩ শিফটে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল তিন হাজার। স্বাধীনতার পর মিলটি জাতীয়করণ করা হয় এবং ক্রমাগত লোকসানে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়।