বিশ্বের শিল্প দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হতাহতের ঘটনা ছিল বাংলাদেশে সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনা। এক হাজার ১৩৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু আর এক হাজারের বেশি আহত হওয়ার সেই ভয়াল দুর্ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়া এ ঘটনার দুই বছর পার হতে চললেও ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ মেলেনি এখনো।
বাংলাদেশে শ্রম আইনে শিল্প দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ খুবই সামান্য। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আইএলও’র (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) উদ্যোগে একটি তহবিল গঠন করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে। আইএলও নীতিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হিসেব করে নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে দেয়া হবে।
মালিকপক্ষ ও ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে (রানা প্লাজা থেকে পোশাক নেয়া ২৯ ক্রেতা) অর্থ চাওয়া হলেও বেশিরভাগ ব্র্যান্ডই অর্থ দেয় নি। তবে আইএলও’র উদ্যোগে গঠিত সমন্বয় কমিটি এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশ অর্থ দিতে সমর্থ হয়েছে। নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে ওই অর্থ বন্টন এবং কয়েক কিস্তিতে দেয়ায় অর্থ কম বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, পুরো সুস্থ না হওয়া সত্ত্বেও তাদের নাম ক্ষতিপূরণের তালিকায় নেই। আবার এই অর্থ স্বচ্ছতার সাথে দেয়া হচ্ছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আরো প্রয়োজন ৬০ লাখ ডলার
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণে উদ্যোগ নেয়। ‘রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ড’ নামে তহবিল থেকে কয়েক কিস্তিতে ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। নিহতদের পরিবারের সদস্য ও আহত শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯শ’ জনকে এ অর্থ প্রদান করা হয়। পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণের জন্য প্রয়োজন ৩ কোটি ডলার। তবে আইএলও’র সর্বশেষ হিসেবে ইতোমধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার এসেছে। আরো প্রয়োজন ৬০ লাখ ডলার। ক্ষতিপূরণ তহবিলে অর্থ দিতে
বড় ব্র্যান্ডগুলোর অনীহা
রানা প্লাজা থেকে পোশাক বানাত বিশ্বখ্যাত ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্ক ও বেনেটনসহ ২৯টি ব্র্যান্ড। এসব ব্র্যান্ডের আকার, মুনাফা ইত্যাদি বিবেচনা করে তাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন হারে অর্থ দেয়ার আহ্বান জানায় আইএলও। কিন্তু দুই বছর পার হলেও অর্ধেকের বেশি ব্র্যান্ড এ তহবিলে অর্থ দেয় নি। একমাত্র প্রাইমার্ক তাদের পোশাক সরবরাহকারী নিউ ওয়েভ বটমের প্রায় সাড়ে ৬শ’ শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের পূর্ণাঙ্গ অর্থ দিচ্ছে।
অর্থ দেয়ার তালিকায় থাকা বাকি ব্র্যান্ডগুলো নামমাত্র অর্থ দিয়ে কোন রকমে দায় সারার চেষ্টা করছে। বেনেটনের কাছে ৫০ লাখ ডলার দাবি করা হলেও সমপ্রতি প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১১ লাখ ডলার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ অর্থকে অপর্যাপ্ত আখ্যা দিয়ে শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
আমস্টারডামভিত্তিক শ্রমিক অধিকার সংগঠন ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইনের প্রতিনিধি ইলেন জেল্ডেনরাস্ট বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল বেনেটনের। কিন্তু ক্ষতিপূরণের নামমাত্র এ অর্থ দেয়ার মাধ্যমে তাদের আসল চেহারা প্রকাশ পেল।’
ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইনের পক্ষ থেকে বলা হয়, রানা প্লাজার ৫টি কারখানা যে ২৯টি ব্র্যান্ডের পোশাক বানাত ওই ব্র্যান্ডগুলো বছরে ২ হাজার ২শ’ কোটি ডলারের ব্যবসা করে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যে অর্থ চাওয়া হয়েছে তা তাদের সম্মিলিত মুনাফার ৫শ’ ভাগের একভাগ (দশমিক ২০ শতাংশ) মাত্র।
রানা প্লাজার দুর্ঘটনার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আজ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হবে।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন শ্রমিক অধিকার সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিল্স), ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংগঠনের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে।
নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের সংখ্যা চূড়ান্ত হয়নি
দুই বছর পার হতে চললেও নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করা যায়নি। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ১৩৭ জন। কিন্তু ডিএনএসহ লাশ চিহ্নিত হয়েছে ১ হাজার ১১২ জনের। তবে এখনো ১৬৬ জন শ্রমিক নিখোঁজ বলে স্বজনরা দাবি করছেন। কিন্তু তারা এখনো নিখোঁজের স্বীকৃতি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংগঠনটি বলছে, গত এক বছরে কোন নিখোঁজ শ্রমিকের সনাক্ত বা নিখোঁজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে আরো গুরুত্বের সাথে কাজ করা উচিত।
তবে শ্রম মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিজিএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ১৬৬ জনের উপর বিভিন্ন উপায়ে খোঁজ নিয়ে নিখোঁজদের একটি সংখ্যা শ্রম মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এক বছর আগে ওই প্রতিবেদন জমা দেয়া হলেও শ্রম মন্ত্রণালয় এখনো তা চূড়ান্ত করতে পারেনি।
তবে শ্রম সচিব মিকাইল শিপার ইত্তেফাককে বলেন, ১৬৬ জনকে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে ৪৮টি জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেয়া হয়। এর মধ্যে ১০৪ জনকে নিখোঁজ হিসেবে ধরা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে বাকি ৬২ জনের বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসন নিখোঁজের নাম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি। এ কারণে তারা তালিকা থেকে বাদ রয়েছে। তবে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিখোঁজ হিসেবে ওই ১০৪ জনের পরিবার ক্ষতিপূরণের আওতায় এসেছেন। তারা বর্তমানে ক্ষতিপূরণের অর্থ পাচ্ছেন।
ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিশৃঙ্খলা
এদিকে ‘রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ড’ এর ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ক্ষতিপূরণের তালিকায় সবাই আসতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থ বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেক শ্রমিকের অভিযোগ তারা আহত হলেও ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি।
সফিকুল ইসলাম নামে এক শ্রমিক জানান, ডান হাত দিয়ে ভারি কোন কাজ করতে পারেন না। পিঠে ও কাঁধে ব্যথা। এ পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকার বাইরে আর কোন অর্থ পাননি।
জেসমিন নামে এক শ্রমিক দুর্ঘটনার দুই দিন পর উদ্ধার হন। তার মেরুদণ্ডের হাঁড় ভেঙ্গে যায়। সুস্থ হলেও কোন কাজ করতে পারেন না। দুই দফায় ৬০ হাজার (৫০ হাজার ও ১০ হাজার) টাকা ছাড়া আর কোন অর্থ পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, এটি কি ন্যায্য পাওনা?