ঠাঁই নেই আইসিইউতে: ঢাকা মেডিক্যালে অপেক্ষায় সংকটাপন্ন রোগীরা

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এনেসথেসিয়া বিভাগের প্রধানের কক্ষ। সালাম দিয়ে ঢুকলেন একজন ইন্টার্ন চিকিত্সক। হাতে ব্যবস্থাপত্র। বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, তার এক স্বজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। আইসিইউতে ভর্তি করানো দরকার। শিক্ষক বললেন, ‘কাকে বের করে ভর্তি করাবো। বের করলেই তো নিশ্চিত মৃত্যু। এখনো অপেক্ষায় আছে আরো ৪০ জন রোগী।’ মলিন মুখে বের হয়ে গেলেন সেই হবু চিকিত্সক।

 
এই হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ‘ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)’ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের অবস্থা। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় রোগীদের জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। এনেসথেসিয়া বিভাগের এক চিকিত্সক আফসোসের সুরে বললেন, আমি এখানে কাজ করি। অথচ আমার স্বজনদের কাউকে আইসিইউতে রাখার সুযোগ পাই না। বাস্তবতা অনেকটা এমনই।
 
এদিকে সরকারি হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে পর্যাপ্ত বেড না থাকার সুযোগে এই চিকিত্সার নামে গলাকাটা বাণিজ্য করছে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল। অভিযোগ রয়েছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে উঠা এসব হাসপাতালে আইসিইউ চিকিত্সার নামে চলছে প্রহসন। চিকিত্সা ব্যয় হিসাবে দৈনিক পরিশোধ করতে হচ্ছে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। আর এই খরচ মেটাতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হচ্ছে রোগীর পরিবার; কিন্তু টাকা দিলেও মানসম্মত চিকিত্সা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এসব হাসপাতালে ভর্তি হলেও রোগীদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। এসব দেখার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং স্বাস্থ্য বিভাগের; কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের নির্বাক দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। 
 
সম্প্রতি রাজধানীতে কাউসার খান নামের এক সংকটাপন্ন রোগীর স্বজনরা জানান, কাউসারকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। সেখানে দৈনিক ১ লাখ টাকা করে গুণতে হয়েছে। কয়েকদিন পর অন্য হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে দৈনিক ৫০ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। একেবারে সর্বস্বান্ত হওয়ার পর উপাচার্যের সহায়তায় কাউসারকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। 
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের একমাত্র ভরসা সরকারি হাসপাতাল। আর্ন্তজাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি হাসপাতালে মোট বেডের ১০ ভাগ আইসিইউ-এর জন্য বরাদ্দ থাকতে হয়। সেই হিসেবে ঢাকা মেডিক্যালের ৩ হাজার বেডের বিপরীতে আইসিইউ-এর জন্য ৩০০ বেড থাকা কথা; কিন্তু এই হাসপাতালে আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ২০টি। ফলে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন সংকটাপন্ন রোগী আইসিইউ বেডের অপেক্ষায় থাকেন। এভাবে অপেক্ষায় থেকে অনেকে মারাও যান।
 
জানা  গেছে, ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউতে চিকিত্সার জন্য তদবির করেন মন্ত্রী, এমপি, সচিবসহ হাইপ্রোফাইল অনেক ব্যক্তি; কিন্তু কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকে না। কেননা একজন রোগীকে আইসিইউ থেকে বের করা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এনেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুর রহমান বলেন, আরো ১৫টি আইসিইউ বেডের জন্য একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো কোন সুফল পাওয়া যায়নি।
 
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট এবং রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট রয়েছে। তবে দক্ষ জনবল না থাকায় এসব আইসিইউ নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলছে।
 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে কোন হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট থাকা বাধ্যতামূলক। তবে দেশে এ নিয়মের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশের সকল মেডিক্যালে আইসিইউ স্থাপন করা হবে। জেলা সদর হাসপাতালেও এই ইউনিট করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিত্তবানদের আইসিইউ স্থাপনে সরকারি হাসপাতালগুলোকে অর্থদান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে দাতার নামে আইসিইউ করা হবে।