দিন দিন দর্শকপ্রিয়তা কমছে ঢাকা চিড়িয়াখানার। নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এখানে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল। সঠিক সেবাযত্নের অভাবে অনেক প্রাণীকে অকালে প্রাণ হারাতে হচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াজার (ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব জু এন্ড অ্যাকুরিয়ামস) সদস্য না হওয়ায় বিদেশ থেকে প্রাণী আনতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।
তবে চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. এনায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রাণীদের যথাযথ পরিচর্যা করি। না করলে তারা অসুস্থ হবে, মারা যাবে।’ তিনি এও বলেন, এখানকার প্রাণীদের সুস্থ রাখতে ব্যাপক কর্মসূচি নিতে হবে। এ ব্যাপারে মত্স্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। চিড়িয়াখানা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ওয়াজার সদস্য হওয়া যাবে।
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত এ চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ৫৩
প্রজাতির ৪৪৭টি স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১১ প্রজাতির ৬১টি সাপ, ১২১ প্রজাতির ৯৯২টি পাখি রয়েছে। এছাড়া ২৩ প্রজাতির মাছ রয়েছে।
মৃত্যুর প্রহর গুণছে প্রাণীরা
জানা গেছে, চিড়িয়াখানায় গত দুই বছরে ৪৬টি প্রাণী নানা কারণে মারা গেছে। ৩৬টি প্রাণী বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছে। অসুস্থ হয়ে পড়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সম্রাট।
চিড়িয়াখানায় ৭৯ বছর বয়স্ক কুমির রয়েছে। কিন্তু সে নড়তে চড়তে পারে না। তবে তার আকৃতির জন্যই দর্শকের ভিড় তার খাঁচার সামনে। হায়েনার অবস্থা জবুথবু। বয়স্ক প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে অলিভ বেবুন, বাগডাশ, ভোঁদর, শঙ্খিনী সাপ, উটপাখি, কোশোয়ারি, সারস, লিলফোর্ড সারস, সাদা পেলিক্যান, মদনটাক (ছয়টি), রয়েল বেঙ্গল টাইগার (সম্রাট), ভারতীয় সিংহ (ভাস্কর, শান্তি), চিত্রা হায়েনা, ডোরাকাটা হায়েনা, কালো ভল্লুক (মিজি ও মিলা), শিম্পাঞ্জি, নীল গাই, হাতি (কুসুমতারা), জলহস্তি (দুটি)।
অতিরিক্ত বয়সের কারণেই এসব প্রাণীর দেহে শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এদের প্রদর্শনীর জন্য খাঁচাতেও রাখা যাচ্ছে না। চিড়িয়াখানার উত্তর লেকের পাশে নিরিবিলি পরিবেশে তাদের রাখা হয়েছে। এতে দর্শনার্থীও তাদের বিরক্ত করতে পারে না। বয়স্কদের মধ্যে অবস্থা খারাপ এমন পাঁচ থেকে ছয়টি প্রাণীকে রাখা হয়েছে চিকিত্সকদের তত্ত্বাবধানে। এদের অনেকের দাঁত নেই, নেই হাঁটাচলার শক্তি, কয়েকটি প্রাণীর চোখও নষ্ট হয়ে গেছে। খাবার দিতে হয় গুঁড়ো করে। ফলে তাদের পরিচর্যা ও খাবার সরবরাহে নানা সমস্যা হচ্ছে। এদের দেখভালের জন্য কর্তৃপক্ষকে বাড়তি জনবল কাজে লাগাতে হচ্ছে।
বয়স্ক ও অসুস্থ প্রাণীর মধ্যে ঘড়িয়ালের বয়স ৩৬ বছর, কুমির পৌঁছেছে ৭৯-এর কোঠায়, সোনালী বুক বানরের বয়স ৩১ বছর। উটপাখির বয়স ২৬ বছর, মদনটাক ২৭-এ পা রেখেছে। ১৯ বছর বয়সী সিংহও অসুস্থ। শিম্পাঞ্জির বয়স ৩৬ বছর। জলহস্তির বয়স হয়েছে ৩৯ বছর। ২০ বছর বয়সী শঙ্খিনী সাপের অবস্থাও খারাপ।
চিড়িয়াখানায় নতুন অতিথি
চিড়িয়াখানার বাসিন্দা আফ্রিকান জলহস্তি, জেব্রা ও অ্যারাবিয়ান হর্স, ইম্পালা ও ওয়াইল্ডবিস্ট পরিবারে যোগ হয়েছে নতুন সদস্য। জানা গেছে, বদ্ধ পরিবেশে সাধারণত এসব প্রাণী বাচ্চা জন্ম দেয় না। দুইটি জলহস্তি শাবকের আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য প্রায় ২ কোটি, জেব্রার ৫০ লাখ ও অ্যারাবিয়ান হর্সের ৫ লাখ টাকা। সবার আগে বিশালদেহী জলহস্তি পরিবারে আসে নতুন দুই অতিথি। একইভাবে অ্যারাবিয়ান হর্স পরিবারে জন্ম নিয়েছে আরেকটি বাচ্চা। পরে ইম্পালা ও ওয়াইল্ডবিস্ট পরিবারে আসে নতুন অতিথি। ঢাকা চিড়িয়াখানার বাসিন্দা জলহস্তি দু’টির জন্ম হয়েছিল কেনিয়ায়। ১৯৯১ সালের জুলাইয়ে কেনিয়া সরকার বাংলাদেশকে এগুলো দান করেছিল। এই প্রাণীর গড় আয়ুষ্কাল ৩২ থেকে ৩৫ বছর। তবে আবদ্ধ পরিবেশে বা বেষ্টনীতে ২৮ থেকে ৩০ বছর বেঁচে থাকে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হতে পারেনি
চিড়িয়াখানার অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণে ওয়াজার সদস্য হতে পারেনি বাংলাদেশ। এ কারণে আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানটি। ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এই সংস্থার সদস্য। আন্তর্জাতিক এই সংস্থার অভিযোগ: ঢাকা চিড়িয়াখানার অবকাঠামো, খাঁচার বিন্যাস ও পরিবেশসহ কোনকিছুই মান উপযোগী নয়। এ কারণে ঢাকা চিড়িয়াখানাকে সদস্য করেনি সংস্থাটি। আর সংস্থার সদস্য না হওয়ায় বৈধপথে পশু-পাখি আনতেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এছাড়া ওয়াজা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না ঢাকা চিড়িয়াখানার কোন কর্মকর্তাকে।
প্রাণী আনা যাচ্ছে না
দরদাতা প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে বিদেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী প্রাণী আনা যাচ্ছে না। সর্বশেষ প্রাণী আনার জন্য একাধিকবার দরপত্র আহবান করা হয়। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়নি। চিড়িয়াখানার প্রাণী ও পাখি আনার জন্য কোন আন্তর্জাতিক দরপত্র গ্রহণ করা হয় না। আর দেশের মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা বিদেশ থেকে প্রাণী আমদানি করে। এদের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে দরপত্রের নিয়ম ভেঙেছে। যথাসময়ে প্রাণী আমদানি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণে ওই প্রতিষ্ঠানটি আর দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না। বাকি রইলো একটি। তবে ওই প্রতিষ্ঠানটি প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে ততটা সক্ষম নয়। এ কারণে বিপাকে পড়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ওয়াজার সদস্য না হওয়ায় বিদেশিরাও প্রাণী দিচ্ছে না। সেক্ষেত্রে নতুন প্রাণী আনতে হলে চোরাই পথই একমাত্র ভরসা। তবে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে বলে চিড়িয়াখানার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
চিকিত্সা ব্যবস্থা ও জনবল সংকট
চিড়িয়াখানার প্রাণী ও পাখির জন্য চিকিত্সা ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারী পাস করে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে এন্ট্রি লেভেলের এক কর্মকর্তা এখানে চিকিত্সা বিভাগের প্রধান হন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিভিএম শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে গৃহপালিত পশু-পাখির চিকিত্সা পদ্ধতি সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। বন্যপ্রাণী সম্পর্কে শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে কিছুটা জানার সুযোগ থাকে। কিন্তু এই বিভাগে পাস একজন শিক্ষার্থীর চাকরির শুরুতে চিড়িয়াখানার মতো স্পর্শকাতর এলাকার চিকিত্সার দায়িত্বে দেয়া হচ্ছে। তার নেই বন্যপ্রাণীসহ অন্যান্য ভিনদেশী প্রাণীর চিকিত্সার বাস্তব অভিজ্ঞতা। নেই বিদেশে কোন প্রশিক্ষণ। এ বিষয়ে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে এসে পশু ডাক্তাররা দেখে দেখে শেখেন। ওয়াজার সদস্য না হতে পারায় উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া যাচ্ছে না।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে যারা চিড়িয়াখানায় পশু চিকিত্সক বা অন্যান্য পদে চাকরি করেন তাদের বন্যপ্রাণীর ওপর বিশেষ কোর্স করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটি হচ্ছে না। পশু-পাখির রোগ নির্ধারণে নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি।
চিড়িয়াখানা অ্যাক্ট নেই
চিড়িয়াখানায় আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া প্রাণীদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। যেগুলো খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে সেগুলোকে অভ্যন্তরীণ হাসপাতালে রাখা হয়। অন্য দেশে বার্ধক্যগ্রস্ত প্রাণীদের মেরে ফেলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে অ্যাক্ট না থাকায় এ ধরনের কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আবদ্ধ খাঁচায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয় তাদের। জানা গেছে, চিড়িয়াখানা অ্যাক্টের একটি খসড়া করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সমস্যার পাহাড়
প্রাণী সংরক্ষণ, প্রাণী কল্যাণ, গবেষণা, শিক্ষা ও বিনোদন-এই পাঁচটি উদ্দেশ্যে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা হলেও একটি উদ্দেশ্যও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। পর্যাপ্ত খাদ্য, বসবাসের পরিবেশ ও চিকিত্সার অভাবে প্রাণীগুলোর শারীরিক অবস্থা ভালো নেই।
১৯৭৪ সালে পুরনো আদলে সাজানো চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের চলাচলের রাস্তাও পরিচ্ছন্ন নয়। পশুপাখির শেডের আশপাশ ঘিরে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। কিছু শেড অকেজো হয়ে আছে। মেরামতের উদ্যোগ নেই। দর্শকদের জন্য যে পাবলিক টয়লেট রয়েছে তা নোংরা এবং ব্যবহার অযোগ্য। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে শিশু পার্ক। তবে সেখানে অকেজো কিছু বিনোদনসামগ্রী রয়েছে। ব্যবহার উপযোগী কোন উপকরণ নেই। পরিবেশও অপরিচ্ছন্ন। পার্কের ভেতরে বসার বেঞ্চগুলো নোংরা।
কোন কোন প্রাণীর খাঁচার বাইরে নির্দেশিকা বোর্ড রয়েছে। আবার অনেক প্রাণীর খাচার বাইরে কোন নির্দেশিকা বোর্ডই নেই। নির্দেশিকা বোর্ডে ওই প্রাণী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ থাকার কথা। কোন কোন বোর্ডের লেখা উঠে গেছে। প্রাণীর খাঁচার কাছাকাছি কোন নিরাপত্তা প্রহরী বা দায়িত্বরতদের কারও দেখা মেলা ভার।
পুষ্টিবিজ্ঞানী কারা
চিড়িয়াখানায় বিভিন্ন ঠিকাদারদের কাছ থেকে খাবার বুঝে নেয়ার একটি কমিটি থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে খাবারের মান নির্ধারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও ঢাকা চিড়িয়াখানায় চোখে দেখে খাবার মান নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এখানে প্রেষণে একজন প্রাণী পুষ্টি কর্মকতা রয়েছেন। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বলেন, এখানে উন্নত কোন যন্ত্রপাতি না থাকায় এমনটি করতে হচ্ছে। চোখে দেখেই অনেক খাবারের মান নিশ্চিত করা সম্ভব।
পেছনে ফেরা
পঞ্চাশের দশকে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে সীমিতভাবে হাতি, চিত্রা হরিণ, বানরসহ কয়েকটি প্রজাতির বন্যপ্রাণী নিয়ে ঢাকা চিড়িয়াখানার যাত্রা শুরু হয়। মিরপুর এলাকায় ১৯৬০ সালে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি মহাপরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। ১৯৬১ সালে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করা হয়। প্রাণীদের বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, হাইকোর্ট সংলগ্ন চিড়িয়াখানা হতে বন্যপ্রাণী স্থানান্তর ও দেশ-বিদেশের প্রাণী সংগ্রহের পর ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন জনসাধারণের জন্য বর্তমান চিড়িয়াখানা উন্মুক্ত করা হয়।
ঢাকা পাল্টে জাতীয় চিড়িয়াখানা
সরকারের মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে ‘ঢাকা চিড়িয়াখানা’ নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা’ করা হয়েছে। নতুন নাম এখন থেকে কার্যকর হবে। ২০১২ সালে জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘোষণার প্রথম উদ্যোগ নেয়া হলেও ২০১৫ সালে এসে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলো। তবে নাম অনুমোদন হলেও এখনো গেজেট হয়নি। নতুন নামের বিষয়ে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি এবং সর্বশেষ ম?ত্স্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয় ৫ ফেব্রুয়ারি সম্মতি দেয়। তার ভিত্তিতে নতুন নামকরণ করা হয়েছে।