বড় ঝুঁকিতে রাজধানী

বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে এখানে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে প্রায় দুই কোটি মানুষের আশ্রয়স্থল রাজধানী ঢাকা। কারণ বাংলাদেশ অবস্থান করছে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং মায়ানমারের টেকটনিকপ্লেটের মধ্যে। বিশ্লেষকরা এতদিন বলছিলেন, ভারতীয় ও ইউরোশীয় প্লেট দুটি (১৯৩৪ সালের পর থেকে) দীর্ঘদিন যাবত্ হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে। অপেক্ষা করছে বড় ধরনের নড়াচড়ার, অর্থাত্ বড় ধরনের ভূমিকম্পের। গতকালের ভূমিকম্পটি হয়েছে আসলে প্লেট দুটির বড় ধরনের নড়াচড়ার কারণে।

 
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বছর দেড়েক আগে আমাদের একটি গবেষণা শেষ হয়েছে। সেখানে আমরা দেখিয়েছি রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রায় বাংলাদেশে ভূমিকম্প হলে শুধু রাজধানীতেই আড়াই লাখ লোক মারা যেতে পারে। ৪ শতাধিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। নেপালে যেটা ঘটেছে আমাদের অবস্থা হতে পারে তার চেয়েও ভয়াবহ।’ তিনি আরও বলেন, ‘বুয়েটে আমাদের যে ব্যবস্থা আছে তাতে দেখা যাচ্ছে গতকাল বাংলাদেশে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে।’
 
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে ৮টি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা বা ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে। এগুলো হলো বগুড়া, রাজশাহীর তানোর, ত্রিপুরা, সীতাকুণ্ড-টেকনাফ, হালুয়াঘাট ডাওকী, ডুবরি, চট্টগ্রাম, সিলেটের শাহজীবাজার (আংশিক-ডাওকী চ্যুতি) এবং রাঙামাটির বরকল চ্যুতি এলাকা। ১৯১৮ সালে বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয় এবং ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে হয় ৬ দশমিক ০ মাত্রার ভূমিকম্প। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মানমন্দিরে জানুয়ারি ২০০৬  থেকে মে ২০০৯ পর্যন্ত ৪ বছরে রিখটার স্কেলে ৪ মাত্রার ৮৬টি ভূ-কম্পন নথিভুক্ত করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ৫ মাত্রার চারটি ভূ-কম্পনও ধরা পড়ে।
 
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানমন্দিরে মে ২০০৭ থেকে জুলাই ২০০৮ পর্যন্ত কমপক্ষে ৯০টি ভূ-কম্পন নথিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৯টিরই মাত্রা ছিল ৫-এর ওপরে এবং সেগুলোর ৯৫ ভাগের উত্পত্তিস্থল ছিল ঢাকা শহরের ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যে। অতীতের এসব রেকর্ড থেকে দেখা যায়, মাত্রা না বাড়লেও ১৯৬০ সালের পর থেকে ভূমিকম্পের হার বেড়েছে, অর্থাত্ ঘন ঘন স্বল্প মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে।
 
অতীতের এসব রেকর্ডকে প্রাধান্য দিয়ে গবেষকরা জানিয়েছেন, যেকোনো সময় বাংলাদেশে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বৈধ-অবৈধ ভবন সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য না থাকলেও কয়েক বছর আগে রাজউকের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এর মধ্যে ৩২১টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে আগের অবস্থায়। এর অধিকাংশই পুরান ঢাকায়।
 

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও ডিজাইন ডিভিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। ফ্রিকোয়েন্সি ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা। যদি ভূমিকম্পের ফ্রিকোয়েন্সি বেশি হয় তাহলে পুরান ঢাকার অধিকাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে। তবে রেট্রোফিটিংয়ের (বিশেষ ধরনের ভবন সংস্কার পদ্ধতি) মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভূমিকম্প সহনীয় করা সম্ভব। জানা গেছে, সচিবালয়ের (১ নম্বর ভবন) মন্ত্রিসভার বৈঠক যে ভবনে অনুষ্ঠিত হয় সে ভবনটিতেও রেট্রোফিটিং করা হয়েছে। এছাড়া অরো অনেক ভবনে রেট্রোফিটিং করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।