ভূমিকম্প মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভূমিকম্প হলে তা মোকাবিলার জন্য নেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল ও সমন্বিত উদ্ধার ব্যবস্থাপনা। কেবল ঢাকা নয় দেশের কোথাও এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোন পূর্বপ্রস্তুতি নেই। শুধু ভূমিকম্প অনুভূত হলেই প্রস্তুতির বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে। কিন্তু পরে আর বাস্তবসম্মত কোন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

 
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের আগে ও পরে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য বাস্তবসম্মত একটি কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করতে হবে। নাগরিকদের পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে।  সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বের ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যে কোন সময়ে দেশে আঘাত হানতে পারে ভয়াবহ ভূমিকম্প। মাঝারি মাত্রার কম্পনেই পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার প্রবল ঝুঁকিতে রয়েছে মেগাসিটি ঢাকা। কিন্তু এই দুর্যোগ মোকাবিলায় নেই  পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল।  দেশে প্রায়ই ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। ভূকম্পনের আগে যেমন কোন পূর্বাভাস দেয়া হয় না, তেমনি নেই কোন পূর্বপ্রস্তুতি। অথচ ক্রমেই বেড়ে চলেছে ঝুঁকির মাত্রা।
 
গতকাল ভূমিকম্পের সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসব হাসপাতালেও ভূমিকম্প হলে ডাক্তার, নার্স এবং অন্যদের কি ভূমিকা পালন করতে হবে সে বিষয়ে কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। এছাড়া রাজধানীর কোথাও কোন ভূমিকম্প শেল্টার নেই। ভূমিকম্প শুরু হলে কোথায় গিয়ে মানুষ নিরাপদে অবস্থান নিবে সেটারও কোন ব্যবস্থা কিংবা নির্দেশনা নেই।
 
এদিকে রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার কার্যক্রমে দেশের দমকল বাহিনীর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বাহিনীতে নেই প্রয়োজনীয় লোকবল ও সরঞ্জাম। সংস্কার করা হয় না ফায়ার স্টেশনের ভবনগুলোও। আবার  দেশের অনেক উপজেলাতে এখনো ফায়ার স্টেশন স্থাপনই করা যায়নি।
 
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম দফতরে তাদের কিছু উদ্ধারকারী যন্ত্র রয়েছে। জেলা স্টেশনগুলোতে তিনটি বড় পানির গাড়িসহ বড় ধরনের ‘হাইড্রোলিক ল্যাডার’ (মই) ও কিছু ভারী যন্ত্রপাতি আছে। তবে মফস্বলের স্টেশনগুলোতে মাত্র একটি করে পানির গাড়ি আছে। বড় মইও নেই।
 
এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ বলেন, ভূমিকম্পসহ যে কোন দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সীমিত প্রস্তুতি রয়েছে, তবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেই। আরো কিছু যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম যন্ত্র রয়েছে। তিনি বলেন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কমিউনিটিতে ভূর্িমকম্প পূর্ব ও পরবর্তী প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে বাসা থেকে বের না হতে পারলে বিল্ডিংয়ের বিমের কাছে, টেবিল বা খাটের নিচে অবস্থান নিতে হবে। যে কোন উপায়ে মাথা রক্ষা করতে হবে। বাড়িতে টর্চ লাইট, খাবার পানি এবং শুকনো খাবার রাখতে হবে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা কোন কাজের সঙ্গে কোন কাজে সমন্বয় নেই। এই ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এখনই রেট্রোফিটিংয়ের (বিশেষ ধরনের ভবন সংস্কার পদ্ধতি)  মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভূমিকম্প সহনীয় করা সম্ভব। সচিবালয়ের (১ নম্বর ভবন) মন্ত্রিসভার বৈঠক যে ভবনে অনুষ্ঠিত হয় সে ভবনটিতেও এটি করা হয়েছে। এছাড়া আরো অনেক ভবনে রেট্রোফিটিং করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সসহ এই ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার করে আরো বেশি কার্যকর করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে একটি মাত্র রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর ২৩ দিন লেগেছে সব কাজ শেষ করতে। আর নেপালের মতো অবস্থা হলে ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশ তো বেরই করা যাবে না।’