বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) ওয়েন্ডি শারম্যান। গণতন্ত্রের স্বার্থে এসব অভিযোগের তদন্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি। একইসঙ্গে সিটি নির্বাচনের মাঝপথে বিএনপির ভোট বর্জনের ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
গত শুক্রবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চতুর্থ অংশীদারিত্ব সংলাপ শেষে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে শারম্যান বক্তব্য রাখেন। সংলাপে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ওয়েন্ডি শারম্যান নেতৃত্ব দেন।
গত ২৮ এপ্রিল তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি সংলাপে উত্থাপন করা হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শারম্যান বলেন, সংলাপে ও এর আগের দিন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাত্কালে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি। ভোটের দিন বিএনপির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তেও আমরা উদ্বিগ্ন। নির্বাচনে অনিয়মগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের ব্যাপারে সবার দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। যাতে আগামী নির্বাচনে পরিস্থিতির ভালো উন্নতি হয়। গণতন্ত্রের জন্য এসব অনিয়মের তদন্ত হওয়া খুবই জরুরি।
এর আগে সাংবাদিক সম্মেলনের শুরুতে দেয়া বক্তব্যে শারম্যান বলেন, সব দলের সমঝোতায় বাংলাদেশে দীর্ঘ মেয়াদী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে আমরা নজর রাখছি। যাতে বাংলাদেশের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি পুনর্বহালের বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে শারম্যান বলেন, বাংলাদেশে গার্মেন্টস সেক্টরে গত দুই বছরে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ২৫০টির বেশি ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন হয়েছে। কর্মীদের জন্য কারখানার অনলাইন ডাটাবেজ ও একশো’র বেশি নতুন শ্রমিক পর্যবেক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসব বিষয় আমরা মূল্যায়ন করছি। তবে এখনো ইউনিয়ন সংগঠক ও নেতারা হয়রানি বা হামলার শিকার হচ্ছেন। জিএসপি পুনর্বহালে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় আরো অনেক কাজ করতে হবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আমেরিকাস) মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান ও মহাপরিচালক (বহিঃপ্রচার) এস বদিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
শহীদুল হক তার বক্তব্যে বলেন, উন্নয়ন ও শাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার তিন ইস্যুতে সংলাপে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। এর বাইরেও কিছু ইস্যুতে আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ইস্যুতে আলোচনার বিষয়ে ওয়েন্ডি শারম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক আমদানিকারক দেশ। বর্তমানে শেভরন ও কোকাকোলার মতো আরো অনেক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী রয়েছে। নতুন করে বিনিয়োগে আমাদের সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করতে আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, আমরা নিরাপত্তা সহযোগিতাও বৃদ্ধি করছি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা রক্ষায়ও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আরও একটি ‘কোস্ট গার্ড কার্টার’ (জাহাজ) হস্তান্তর করা হবে।
আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, তিন ইস্যুর বাইরে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সংক্রামক ব্যাধি ও ‘ব্লু ইকোনমি’ ইস্যুতে আমাদের বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। দুটি মধ্যপন্থী, বহুত্ববাদী দেশ যাতে একত্রে কাজ করে তাদের উন্নয়ন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সমন্বয়ের লক্ষ্য এগিয়ে নিতে পারে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক শক্তিশালী ও বিস্তৃত উল্লেখ করে শারম্যান বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরালো করতে আমরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। একইসঙ্গে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করছি।
প্রসঙ্গত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দৃঢ় করতে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্যন্ত চারটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।