অবরোধে পরিবহন খাতে ক্ষতি শত কোটি টাকা

বিএনপি নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোটের তিন মাসের হরতাল-অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবহন খাত। এ সময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ১ হাজার ২৩০টি যানবাহন। ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকার উপরে।  অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন তিন শতাধিক যাত্রী ও শ্রমিক। নিহত হয়েছেন ৫৫ জন যাত্রী ও শ্রমিক। সবটাই ঘটেছে পেট্রোল বোমার আগুনে। তবে গত মাস  থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তিন দফায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৮৬ জন পরিবহন মালিক এবং অগ্নিদগ্ধ ১৯৩ জন শ্রমিক-যাত্রীকে প্রায় আট কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য পরিবহন মালিকরাও ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু এরপরও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন পরিবহন সেক্টরের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

 
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘সর্বশেষ হরতাল-অবরোধে পরিবহন খাতে  ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত মালিক ও শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা দেয়ায় তাদের ভেঙ্গে যাওয়া মনোবল কিছুটা চাঙ্গা হয়েছে।’
 
সূত্র জানায়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ১৪৬ জন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন মালিককে ৪ কোটি ২০ লাখ ৬৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করেন। দ্বিতীয় দফায় গত ১২ মার্চ ক্ষতিগ্রস্ত ২৬৫ জন পরিবহন মালিককে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৭৫ জন পরিবহন মালিক। আর একই দিন আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন হরতাল-অবরোধের সময় অগ্নিদগ্ধ ১৯৩ জন যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিক ( চালক ও হেলপার)।
 
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনারস এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘অবরোধ-হরতালে আমাদের ৮টি বাস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, ভাংচুর হয়েছে ২৫টি বাস। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছি। পাবো বলে আশাবাদী।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি যে অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল, সেখান থেকে সহজে ফেরা যাবে কী-না  এ নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় পরিবহন সেক্টরে স্বস্তি ফিরেছে।’ ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এতে পরিবহন মালিকদের মনোবল চাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু পরিবহন সেক্টরের অদৃশ্য যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে আরো অনেক সময় লাগবে। গাড়ি ভাংচুর বা অগ্নিসংযোগে যে ক্ষতি হয়েছে তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায়। পাশাপাশি রয়েছে ব্যাংক ঋণ।’
 
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক  রুস্তম আলী খান বলেন, তাদের দুই শতাধিক পণ্যবাহী গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ওই সময় পণ্য মালিকরা খুব জরুরি না হলে পণ্য পাঠাতে বিরত থাকেন। ফলে পণ্য পরিবহন ব্যবসায় গুণতে হয়েছে বিরাট অংকের ক্ষতি। ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় প্রাপ্ত অর্থ কিছুই না। তারপরও বলতে হবে এরফলে  মালিকরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে। তবে ব্যাংক ঋণের বোঝা নিয়ে পরিবহন মালিকরা রীতিমতো দিশেহারা। সময়মত কিস্তি পরিশোধ না করায় অনেকে ঋণখেলাপি হয়ে গেছেন।
 
বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, হরতাল অবরোধে তার পরিবহনের বেশ কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষরিপূরণের আবেদন জানিয়েছেন। তবে এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। তিনি আরো বলেন, ২০১৩ সালের হরতাল অবরোধের সময় ক্ষতির ব্যাপারে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ রিশিডিউল করেছিল। কিন্তু এবার ব্যাংকগুলো ঋণ শিডিউল করেনি। ফলে ঋণের টাকা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন পরিবহন মালিকরা।
 

এদিকে পরিবহন নেতৃবৃন্দ যে ক্ষতির কথা বলেছেন- সে ব্যাপারে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, হরতাল অবরোধের সময় পরিবহন মালিকরা রাস্তায় পুরনো গাড়ি বের করেন। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি পুড়লেও ইঞ্জিন থেকে যায় অক্ষত। ফলে পরিবহন মালিকরা টাকার অংকে যে ক্ষতির কথা বলেছেন তা সঠিক নয়।