সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন এবং তার পোস্টমর্টেম

সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনতো হয়ে গেল। তারপর? কারা হারলেন, কারা জিতলেন, গণতন্ত্রের অগ্রগতি, না দফারফা কোনটা হলো? এসব প্রশ্নের জবাব নিয়ে সংবাদপত্রে, টিভিতে আলোচনার ধুমধুমাক্কার চলছে। দেশি পণ্ডিতদের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকেরাও গলা মিলিয়েছেন, তাদের কথা নির্বাচনের সতীত্ব রক্ষা পায়নি, এই সতীত্ব হরণ করলো কারা? আওয়ামী লীগ, না বিএনপি? বিএনপি বিরোধী দল হলে কি হবে, তার গলায় জোর অনেক বেশি। গলার জোরে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নয়ছয় করেছে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেছে। বিএনপিকে প্রচার অভিযান চালাতে দেয়নি। বিএনপি বাধ্য হয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছে। প্রমাণ করেছে, এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হতে পারে না।
 
আমি দেশ থেকে বহুদূরে থাকি। তাই নির্বাচন নিয়ে এতো শোরগোলের মধ্যে যথার্থ সত্যি কোনটা তা বোঝা মুশকিল। আওয়ামী লীগ সমর্থককে জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই। তিনি বলবেন এমন সুষ্ঠু নির্বাচন আর হয় না। বিএনপি সমর্থককে জিজ্ঞাসা করলে বলবেন, এই নির্বাচন অতীতের সকল কারচুপিকে হার মানিয়েছে। তাই কোনো রাজনৈতিক বন্ধুর কাছে ২৮ এপ্রিলের নির্বাচন সম্পর্কে কিছু জানতে না চেয়ে রাজনীতির ধারে কাছে নেই, এক গোবেচারা স্কুল-শিক্ষক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছি। এই নির্বাচন সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?
 
তিনি বললেন, এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বাড়াবাড়ি, ছাত্রলীগের উত্পাত, ভুয়া ভোটপত্রে সিল মারা যে একেবারে হয়নি তা নয়। কিন্তু হয়েছে খুব কম ভোট কেন্দ্রে। ধরুন ২০২৭টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে পঞ্চাশ কি পঞ্চান্নটি ভোট কেন্দ্রে। মারামারিও হয়েছে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেই বেশি। কিন্তু একশ্রেণীর মিডিয়ার কল্যাণে তিলকে তাল করা হয়েছে। কয়েকটি ভোট কেন্দ্রের হাঙ্গামার দৃশ্যকেই আউট অব প্রোপোরসন তুলে ধরে দেশের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে, তিনটি সিটি কর্পোরেশনের সকল ভোট কেন্দ্রেই এই হাঙ্গামা চলেছে।
 
শিক্ষক বন্ধু বললেন, বাংলাদেশে এই নির্বাচনে যা হয়েছে, উপমহাদেশের কোন দেশে এর চাইতে বড় হাঙ্গামা ছাড়া কোনো নির্বাচন হয়েছে, তার উদাহরণ আমাকে দেখান। আর এই হাঙ্গামার জন্য যদি বিএনপি মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা ভোট দিতে না পেরে থাকেন, তাহলে এই মেয়র পদপ্রার্থীরা ভোটদান শুরু হওয়ার শুরুতেই নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা সত্ত্বেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার লাখ লাখ ভোট পেলেন কিভাবে? চট্টগ্রামের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীতো তার ভোটবাক্সে বিপুল ভোট পড়েছে দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছেন, আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও আমার ভোটবাক্সে এতো ভোট পড়ে কিভাবে?
 
শিক্ষক বন্ধু বললেন, যারা এখন নির্বাচনের ক্রেডিবিলিটি নিয়ে হৈ চৈ করছেন, তারা এই প্রশ্নটির জবাব দিচ্ছেন না। আমি তাকে বলেছি, আওয়ামী লীগ সরকারের সবচাইতে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, একাধিক দলীয় প্রার্থীকে দলের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে মারামারি করতে দেওয়া এবং বেগম জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা বন্ধ করতে না পারা। এই হামলায় সরকারি দলের বড় ধরনের যোগসাজশ ছিল বলে আমিও সন্দেহ করি। এই হামলা আওয়ামী লীগ সরকারের নিরপেক্ষতার ক্রেডিবিলিটি অনেকটাই নষ্ট করেছে।
 
শিক্ষক বন্ধু বললেন, এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে সহমত পোষণ করি। তবে আপনার এই মন্তব্যে আমার একটু সংশোধনী আছে। আমার ধারণা, একটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী তার সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে অবশ্যই প্রচারণায় নামতে পারেন। কিন্তু অহেতুক নিরাপত্তা রক্ষী বেষ্টিত বিশাল গাড়িবহর নিয়ে এতো শানশওকতের সঙ্গে তার প্রচারণায় নামার ধরন দেখে সন্দেহের উদ্রেক করে। মনে হয় বিএনপি নেত্রীও চেয়েছিলেন তার গাড়িবহরে একটা হামলা হোক। তিনি যেন এটাকে একটা ইস্যু করে নির্বাচন বর্জন করতে পারেন।
 
তার এই রাজকীয় গাড়িবহরের মিছিল ছিল একশ্রেণীর মানুষকে হামলা চালাতে উস্কানিদানের মতো, মাত্র কয়েকদিন আগে বেগম জিয়ার নির্দেশে শুধু গাড়ি বাড়ি নয়, অসংখ্য মানুষ পুড়ে মরেছে। তিনি যতোই “জননেত্রী” হোন, এই হত্যার রাজনীতির জন্য এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মনে ক্ষোভ ও ক্রোধ আছে। তাদের সঙ্গে একদল আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ সমর্থক মিলে এই হামলা যদি চালিয়ে থাকে, তাহলে বিস্ময়ের কিছু নেই। এই হামলাকারীরা হয়তো বুঝতে পারেনি, হামলা চালাতে গিয়ে তারা বিএনপির ট্রাপেই পা দিচ্ছে।
 
আমি এই শিক্ষক বন্ধুর ধারণাকে অমূলক মনে করি না। কিন্তু যে কারণেই বেগম জিয়ার গাড়িবহরে হামলা হয়ে থাকুক, সরকারি দলের উচিত ছিল তা আগেভাগে অনুমান করে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা। বিএনপি তাহলে এই কৌশলের যুদ্ধে সাফল্য দেখাতে পারতো না। আমি এই শিক্ষক বন্ধু ছাড়াও ঢাকার আরও দু’একজন বন্ধুকে বিএনপির আকস্মিক নির্বাচন বর্জন সম্পর্কে তারা কি ভাবেন তা জানতে চেয়েছি। তারাও দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেউ নন। তাদের অভিমত শুনে ভালো লাগলো এটা জেনে যে, ঢাকার একটি ইংরেজি ও একটি বাংলা দৈনিকের এই নির্বাচনকে হেয় করার অবিরাম প্রচারণা সত্ত্বেও সচেতন নাগরিকদের একটা বড় অংশকেই তারা বিভ্রান্ত করতে পারেননি।
 
খ্যাতনামা কলামিস্ট বা টিভি টক শো’র বিশিষ্ট আলোচক নন, এমন সাধারণ পেশাজীবী দু’একজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছি, তাদের কেউ কেউ সন্দেহ করেন, বিএনপি পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। জানুয়ারি থেকে তাদের সন্ত্রাসের রাজনীতি দেশবাসীর মনে এতোটা ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল যে, নির্বাচনে যোগ দিয়ে তারা এই ক্ষোভ নিরসন করতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া বিএনপি’র মধ্যেও ছিল একটা নির্বাচনমুখি হাওয়া। বেগম জিয়া তাই চেয়েছেন নির্বাচনে যোগ দিয়ে আগের পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের মতো যদি জিতে যাওয়া যায় তাহলে তো খুবই ভালো। কিন্তু জেতার সম্ভাবনা না থাকলে এমন পরিবেশ তৈরি করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো যে, ভোটদাতারা যাতে বুঝতে পারেন, আওয়ামী লীগের বাড়াবাড়ির জন্য বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য হলো।
 
দেশের সাধারণ মানুষের একটা অংশ যে বিএনপির এই চালাকিটা বুঝতে পেরেছে এখানেই দেশের দু’টি তথাকথিত নিরপেক্ষ বিগ মিডিয়ার প্রচারণার ব্যর্থতা। বিএনপি’র দুনম্বর কৌশলটি ছিল, তাদের সমর্থক ভোটদাতাদের নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ শুরু হতেই আগেভাগেই গিয়ে ভোটদানের কাজটি সেরে ফেলার জন্য বলা। যদি তারা দেখতেন, আগের পাঁচটি নির্বাচনের মতো তাদের জেতার সম্ভাবনা নিশ্চিত, তাহলেও তারা সম্ভবত নির্বাচন বর্জন করতেন। কারণ, তাদের লক্ষ্য সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আর জেতা নয়। তাতে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয় না। আগের পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের জয় তাদের এই শিক্ষাই দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য অবিলম্বে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হউক তাহলে তারা মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছতে পারেন। একটি মধ্যবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ের স্বার্থে তারা বর্তমানের তিনটি সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনে নিজেদের জেতার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাকেও বলি দিলেন।
 
এই ব্যাপারে বিএনপি যে সূক্ষ্ম কারসাজিটা করেছে তা যে এতো প্রচার-প্রচারণায় ডামাডোলের মধ্যেও সাধারণ ভোটদাতাদের একটা অংশ বুঝতে পেরেছেন এটা এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য। বিএনপি যে নির্বাচন বর্জন করতে পারে এই কানাঘুষাটা বাজারে আগে থেকেই ছিল। এমনকি দলের কোনো কোনো নেতা ও কর্মীর মধ্যে এ সম্পর্কে টেলিফোন-আলাপের যে খবর সংবাদপত্রে ফাঁস হয়েছে, তাতেও বুঝা যায়, নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাটি ছিলো আকস্মিক, কিন্তু সিদ্ধান্তটি ছিল আগেই নেওয়া।
 
কথায় বলে হিসেবের কড়ি বাঘে খায় না। কিন্তু বিএনপি’র হিসেবের কড়ি এবার বাঘে খেয়েছে। আগের পাঁচটি পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে আওয়ামী লীগ এবার জোর লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা সম্ভবত আন্দাজ করেছিলেন লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে। তাই ভোট কেন্দ্রে তাদের উপস্থিতির প্রাধান্যটা এবার চোখে পড়ার মতো ছিল। এ ক্ষেত্রে বিএনপি’র কৌশলটা ছিল ভোটগ্রহণের প্রথম পর্বেই তাদের সমর্থকেরা গিয়ে ভোট দিয়ে ফেলবেন। তারপর তারা আকস্মিকভাবে নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবেন। তাতে আওয়ামী সমর্থক ভোটদাতারা একটু ঝিমিয়ে পড়বে, ভাববে বিএনপি যখন নির্বাচনে থাকছে না, তখন আর এতো দৌড়-ঝাঁপ করে লাভ কি? আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীতো এমনিতেই জিতবে। সুতরাং আমরা কিছু লোক ভোট না দিলেও ক্ষতি নেই।
 
বিএনপি’র এই কৌশলটা যদি সফল হতো, অর্থাৎ তাদের আকস্মিক নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় আত্মসন্তুষ্ট আওয়ামী সমর্থক ভোটদাতারা আর ভোট দিতে না যেতেন তাহলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেও কেল্লা ফতে করতো। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটদানে অনাগ্রহের সুযোগে তাদের কোনো মেয়র পদপ্রার্থী হয়তো নির্বাচনে সরে দাঁড়িয়েও জিতে যেতেন। তাতে আগের পাঁচটি মেয়র পদে হেরে যাওয়ার লজ্জা থেকেও বেশি লজ্জা পেতে হতো সরকারি দলকে।
 
কিন্তু আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা এবার এ ভুলটি করেনি। লড়াইয়ের মাঠে প্রতিপক্ষ গরহাজির দেখেও তারা পলাশীর যুদ্ধে নবাব সৈন্যদের মতো ময়দান ছেড়ে চলে যায়নি। বিএনপি’র সমর্থক সকল ভোটদাতাও ভোট দানে বিরত থাকেননি। ফলে লড়াইয়ের মাঠ থেকে বিএনপি “সাফল্যজনক পশ্চাত্পসরণনের” অভিসন্ধি নিয়ে সরে দাঁড়ালেও লড়াইটা একতরফা হয়নি। বিএনপি তুচ্ছ অজুহাতে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে তাদের কোনো কোনো মেয়র প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা ছিল। কেউ কেউ বলেন, এই সম্ভাবনা বেশি ছিল চট্টগ্রামে। বিএনপি এটা না জানে তা নয়। কিন্তু তাদের শর্ত অনুযায়ী সরকারের কাছ থেকে একটি মধ্যবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য করেছে। তাদের লক্ষ্য সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদের পছন্দের ব্যবস্থায় অবিলম্বে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায় করা। বিএনপি নেত্রী জানেন, লোকাল সেলফ গভর্নমেন্টের নির্বাচনে জিতে তার সহসা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
 
তাই বিএনপি’র এই নির্বাচন বর্জনের নাটক। নইলে এই নির্বাচনে যেটুকু হুড় হাঙ্গামা হয়েছে তা নির্বাচন বর্জন করার মতো অতো ব্যাপক ছিল না। যেসব কেন্দ্রে হাঙ্গামা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে পুন:নির্বাচনের ব্যবস্থাই তার প্রতিবিধান। বিএনপি-নেত্রী কেন রজ্জুতে সর্পভ্রম করলেন, সেটাই এখন জিজ্ঞাস্য। নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি, সুশীল সমাজের একাংশ, বিশেষ করে দু’টি ‘নিরপেক্ষ’ মিডিয়ায় যে কনসার্টেড প্রচারণা তা দেখে মনে হয়, নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হোক এটা তাদের লক্ষ্য ছিলো না। তাদের লক্ষ্য যেভাবেই হোক, এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা, প্রমাণ করা এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হতে পারে না—ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
ঢাকার কোনো কোনো বন্ধু আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, নির্বাচন বর্জনের পরই বিএনপি হয়তো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি এই অজুহাত তুলে আবার হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি দিতে চাইবেন। তা তারা এখন পর্যন্ত দেননি। বিএনপি-নেত্রী হয়তো তার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, দেশের মানুষ বিএনপি-কে ভোট দিতে পারে, কিন্তু তাদের আন্দোলনের ডাকে আর সাড়া দেবে না। বরং বিএনপি’র হিংসাত্মক আন্দোলন প্রতিরোধে তারা মাঠে নামতে পারে। বিএনপি’র এখন সম্ভবত ভরসা, বিদেশি পৃষ্ঠপোষক ও দেশি সুশীল সমাজের অনুগত অংশ দ্বারা সরকারের উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে নতি স্বীকারে বাধ্য করা। এই কৌশল এবারেও সফল হবে মনে হয় না। হাসিনা সরকার অতীতে বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে মার্কিন প্রশাসনের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার যে গাত্রাবরণ তৈরি করতে পেরেছে, তা এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা বান কি মুনের প্রথাগত চাপ অনায়াসে সহ্য করতে পারবে। আর দু’টি নিরপেক্ষ মিডিয়া তার পাঠকদের কাছে এতো বেশি এক্সপোজ্ড যে, সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে প্রচারণায় তারা যে উদ্দেশ্যমূলক বাড়াবাড়ি করছে তা অনেকের কাছেই স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
 
এই নির্বাচনকে হেয় করার জন্য বিএনপি ও সুশীল সমাজের একাংশের যে কনসার্টেড প্রচারণা, তাকে ঠেকাতে হলে তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়রকেই কথায় ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে নয়, তাদের পারফরমেন্স দ্বারা দ্রুত জনচিত্ত জয় করতে হবে। সরকারকেও এই কর্পোরেশনগুলোর ক্ষমতার পরিসর বাড়াতে হবে। মেয়রদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নবনির্বাচিত মেয়রেরা যদি দলের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে নির্দলীয় পুর পিতা হিসেবে দ্রুত এমন কিছু কাজ করতে পারেন, যা তিনটি কর্পোরেশনেরই এলাকার নাগরিক জীবনের অসহনীয় কিছু যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের উপশম ঘটাবে, তাহলে “নিরপেক্ষ-কাম-সুশীলদের” এই প্রচারণার ঝড় তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারবে না। এখন প্রশ্ন, নবনির্বাচিত তিন মেয়র তা পারবেন কিনা, না গতানুগতিকতার স্রোতে গা ভাসাবেন?
 
নগর জীবনের চৌদ্দ আনা না হোক দশ আনা সমস্যা সমাধানেও যদি নবনির্বাচিত মেয়রেরা তাদের আন্তরিকতা, আগ্রহ ও দক্ষতা দেখান, তাহলে বর্তমান নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে বলে আমার বিশ্বাস। বিএনপি-কেও তখন তাদের মাথায় হরতাল-অবরোধের কোনো চিন্তাভাবনা থাকলে তা ঝেড়ে ফেলতে হবে।