ইতিহাস গড়লেন হাসিনা-মোদী

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ইতিহাস রচিত হলো। গতকাল বুধবার ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত বিলটি (১১৯তম সাংবিধানিক সংশোধনী) পাস হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ইতিহাসের রূপকার। ভারতের রাজ্যসভায় বিলটি পাসের ক্ষেত্রেও ইতিহাস তৈরি হলো। সর্বসম্মতিক্রমে গতকাল বিলটি পাস হয়। রাজ্যসভায় বিলটি উত্থাপন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। বিলটি আজ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় উত্থাপন করার কথা রয়েছে। আজ পাস হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগামী জুনে বাংলাদেশ সফরের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ভারতের মন্ত্রিসভায় বিলটির অনুমোদন দেয়া হয়। এদিকে, রাজ্যসভায় স্থল সীমান্ত চুক্তি বিল পাস হওয়ায় স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। খবর পিটিআই, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও দ্য হিন্দুর

 
প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে
 
বহু প্রতীক্ষিত বিলটি রাজ্যসভায় পাস হওয়ায় দুই দেশের ছিটমহল বিনিময়ের পথ প্রশস্ত হলো। বাংলাদেশের সঙ্গে ভূমি বিনিময়ে ভারতের সংবিধান সংশোধনের এই বিলে ১৮০ সদস্য পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে কোনো ভোট পড়েনি। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বুধবার রাতের মধ্যে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কাছ থেকে বিলটি সই করিয়ে নেবে বলে দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছেন। আজ বিলটি লোকসভায় উঠবে। পরশু লোকসভার অধিবেশন শেষ হবে। ইতোমধ্যে বিজেপি নেতৃত্ব দলের সব সংসদ সদস্যদের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার লোকসভায় উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকসভায় বিলটি পাস হলে দুর্ভোগের অবসান ঘটবে বলে আশায় আছেন দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা। বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোতে জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ১৪ এবং ভারতীয় ছিটমহলগুলোতে জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার।
 
রাজ্যসভায় ঐতিহাসিক ভোট
 
নানা অচলাবস্থা আর টানাপোড়েন শেষে সীমান্ত বিলটি গতকাল রাজ্যসভায় উঠে। রাজ্যসভার কার্য উপদেষ্টা কমিটি এই বিল নিয়ে আলোচনার জন্য তিন ঘন্টা সময় বেঁধে দেয়। গতকাল সুষমা স্বরাজের উত্থাপনের পর বিলের ওপর আলোচনা শুরু হয়। দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে স্থানীয় সময় ৪টা ৩২ মিনিটে ১৮০ সংসদ সদস্যের ভোটে বিলটি পাস হয়। দেশটির সংবাদ মাধ্যম জি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোন বিতর্ক ছাড়াই ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিলটি পাস হওয়ায় একটি ইতিহাস সৃষ্টি হলো। বিলটি উত্থাপনের সময় সুষমা স্বরাজ স্বীকার করেন, ২০১৩ সালে কংগ্রেস আমলে বিলটি রাজ্যসভায় উত্থাপন করা হলেও তত্কালীন বিরোধী দল বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস এর বিরোধিতা করেছিল। তার এই স্বীকারোক্তির জন্য বিরোধী কংগ্রেস দলের সদস্যরা তাকে ধন্যবাদ জানান। বিল পাসের ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রাজ্যসভায় বলেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে প্রতিবেশি দুই দেশের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে। একই সাথে ভারতও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজন এর মাধ্যমে লাভবান হবে।
 
বিরোধিতার পর আশার আলো
 
আসাম বিজেপির পক্ষ থেকে স্থল সীমান্ত চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতার মুখে চুক্তি থেকে আসামের ছিটমহলগুলো বাদ দেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিবেচনা করছেন বলে এর আগে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর স্থল সীমান্ত চুক্তি থেকে আসামকে বাদ না দিতে মোদীকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ। আসামকে বাদ দিলে রাজ্যসভায় এ বিল পাসে সমর্থন দেওয়া হবে না বলে ইঙ্গিতও দিয়েছিল কংগ্রেস, যারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই বিল পার্লামেন্টে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপরই অপরিবর্তিত অবস্থায় বিলটি পাসের ব্যাপারে আশার আলো দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত সোমবার রাতে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহর বাসভবনে এক বৈঠকে আসামকে রেখেই প্রস্তাবটি পাসের জন্য তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী মোদীর সভাপতিত্বে মঙ্গলবার ভারতের মন্ত্রিসভা সংবিধান সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন করে। কাল শুক্রবার লোকসভার চলতি অধিবেশন শেষে চীন, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। এরপর জুন বা জুলাইয়ে বাংলাদেশে আসতে চান তিনি। তবে ভারতীয় কূটনীতিকরা ইংগিত দিয়েছেন, ‘খালি হাতে’ ঢাকা সফরে যাওয়া মোদীর ‘ঠিক হবে না’। এ কারণে লোকসভার চলতি অধিবেশনেই বিলটি পাস করিয়ে আনতে মোদীর এই তাড়াহুড়ো। এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এসেই প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেন। সকল বিরাজমান বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেন। স্থল সীমান্ত চুক্তিতে মূলত আশার আলো দেখা যায় গত বছর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বৈঠকে। ওই বৈঠকেই মোদী শেখ হাসিনাকে স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন। আর আজ লোকসভায় বিলটি পাস হলে সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে যাচ্ছেন মোদী।
 
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি
 
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে পরিচিত ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে প্রটোকলে স্বাক্ষর করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। বাংলাদেশ ওই চুক্তিতে অনুসমর্থন দিলেও জমি হস্তান্তরে ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি আটকে থাকে। ভারতের বিগত কংগ্রেস সরকার কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও বিজেপি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতায় রাজ্যসভা ও লোকসভায় তা পাস করাতে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসাবে ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেন। শুরু থেকে আপত্তি করে আসা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাও নানা চাপের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।
 
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি ও এর প্রটোকল বাস্তবায়িত হলে কয়েক দশকের পুরনো সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়ার পাশাপাশি সীমান্তে আসবে শান্তি। ছিটমহলের বাসিন্দাদের গত সাত দশকের মানবিক সংকটের অবসান ঘটবে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ হবে তাদের। একই সঙ্গে খুলবে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত। দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় এবং সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিত করাই এই স্থল সীমান্ত চুক্তির লক্ষ্য। সাড়ে ৬ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা চিহ্নিত করা হবে। ছিটমহলগুলোর মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি (৭ হাজার ১১০ একর জমি) এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি (১৭ হাজার ১৬০ একর) জমি বিনিময় হবে। অপদখলীয় জমির মধ্যে মেঘালয়, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অধীন সীমান্তে ২০০০ একর জমি এবং আসামের ২৬৮ একর জমির অধিকারী হবে বাংলাদেশ।
 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত সমস্যার সমন্বিত সমাধানে পৌঁছার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ১৯৫৮ সালের নেহরু-নুন চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে সীমানা জটিলতার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওই দুই চুক্তিতে প্রায় ৬.১ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমান্ত, ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় ভূমির বিষয়ে কোনো সমাধান ছিল না।  ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর কোনো বাসিন্দাকেই নিজ বসতবাড়ি ও জীবিক ছেড়ে অন্যত্র যেতে হবে না। ছিটমহলগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে উভয় দেশের প্রতিনিধিদল সেগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে ব্যাপক পরিসরে মতবিনিময় করেছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৬৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদন হতে হবে। এরপর তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করলেই সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।