চলে গেলেন বাংলাদেশের চিত্রকলা জগতের অভিমানী শিল্পী, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম রূপকার ভাস্কর নভেরা আহমেদ। ফ্রান্সের মাতিসে নিজ বাসায় বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে মারা গেছেন বলে প্যারিসে বসবাসরত শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ দৈনিক ইত্তেফাককে জানিয়েছেন (ইন্নালিল্লাহে..রাজিউন)। আগামী সোমবার প্যারিসে তাকে দাফন করা হবে। গতকাল রাতে টেলিফোনে তিনি জানান, বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের এই অগ্রদূত বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। চিকিত্সায় খুব একটা কাজ না হওয়ায় ১৭ দিন আগে চিকিত্সকের পরামর্শে ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল তাঁকে। ঘুমের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান, ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে শিল্পী নভেরা আহমেদ জাতীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, নভেরা আহমেদের মৃত্যু সংবাদ জেনেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে জানিয়েছি।
শিল্পী নভেরা আহমেদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা. সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ শোক জানিয়েছেন দেশের বরেণ্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট জনেরা।
একুশে পদক প্রাপ্ত ভাস্কর্য শিল্পী নভেরা আহমেদ ১৯৭৩ সাল থেকে প্যারিসে বসবাস করছিলেন। শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভ যেটিকে মাতৃমূর্তির রূপক মনে করা হয় সেটি শিল্পী হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের যৌথ সৃষ্টি। গুণী এই শিল্পী ১৯৬১ সালে ভাস্কর হিসেবে পান জাতীয় স্বীকৃতি। ১৯৯৭ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। ১৯৩০ সালে জন্ম নেয়া অন্তর্জালে সম্মোহিত, প্রচার বিমুখ শিল্পী নভেরা আহমেদের অসংখ্য কাজের মধ্যে বিখ্যাত মেডিটেশন, পরিবার, যুগল, জেব্রা ক্রসিং, ইকারুস, লুনাটিক টোটেম। এই শিল্পীর কাজে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মরমী ভাবের প্রকাশ।
নভেরার জন্ম সুন্দরবনে ১৯৩০ সালে। পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আসকারদীঘির উত্তর পাড়ে। চাকরিসূত্রে বাবা সাইদ আহমেদ পরবর্তীতে কলকাতায় ছিলেন। নভেরার শৈশব কেটেছে কলকাতায়। নভেরা কলকাতার লরেটা থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুল জীবনেই তিনি ভাস্কর্য গড়তেন।
৪১ বছর পর প্যারিসে ভাস্কর নভেরা আহমেদের রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী শিল্পকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি। প্রায় ১০০ দিন ব্যাপী প্রদর্শনীতে সাজান হয় তার ১৯৬৯ থেকে ২০১৪ সার পর্যন্ত ৫১টি শিল্পকর্ম দিয়ে। এর মধ্যে ছিল ৯টি ভাস্কর্য ও ৪২টি চিত্রকর্ম।
১৯৫৪ সালে নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমান একসঙ্গে ফোরেন্সে যান। ১৯৫৬ জুন মাসে নভেরা ও হামিদ একসঙ্গে দেশে ফিরে এলেন। ঢাকায় তখন স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পরিকল্পনায় আধুনিক স্থাপত্য নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়েছে। তারই উদ্যোগে নবনির্মিত পাবলিক লাইব্রেরি, পরবর্তীকালে যেটা ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। শহীদ মিনারের মূল যে স্তম্ভটি, যাকে মাতৃমুতির্র রূপক মনে করা হয় তার আনতভঙ্গি প্রথমে যেটি হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের উপস্থিতিতে নির্মিত হয়। সেটি বর্তমানের মাতৃমূর্তিটির মতো কৌণিক ছিল না।