৪১ বছরের অমীমাংসিত ও জটিল স্থল সীমান্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক রাখিবন্ধনে আবদ্ধ হলো বাংলাদেশ ও ভারত। প্রায় সাত দশক ধরে বঞ্চনা, কষ্ট আর ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল সীমান্ত চুক্তি অবশেষে বাস্তবে রূপ পেল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় পাস হলো ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তি বিল (১১৯ তম সংবিধান সংশোধনী বিল-২০১৩)। এর আগের দিন বুধবার উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায়ও বিলটি পাস হয়। মঙ্গলবার বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া হয়। বিল পাসের মাধ্যমে যেমন বাংলাদেশ ও ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে বোঝাপড়া ও কূটনীতির ক্ষেত্রে একটা ইতিহাস সৃষ্টি হলো তেমনি ভারতের পার্লামেন্টেও কোন বিল পাসের ক্ষেত্রেও নজির হয়ে থাকলো। গত দুইদিনে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়। বিল উত্থাপনকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ জানিয়েছেন, একইভাবে তিস্তা চুক্তির সমস্যারও সমাধান হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী বিলের পক্ষে ভোট দেয়ায় কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীসহ সব বিরোধীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী বিল পাসের এই ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে এ ব্যাপারে বাংলায় কথা বলেছেন। লোকসভায় পাসের পর এখন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভার সমর্থন লাগবে যা পেতে কোনো সমস্যা হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লোকসভায়ও বিরল ভোট
নয়াদিল্লির স্থানীয় সময় গতকাল ৬টা ২০ মিনিটে লোকসভায় উপস্থিত ৩৩১ সদস্যের সবাই বিলের পক্ষে ভোট দেন। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে বিল পাসের ঘটনা বিরল। বুধবার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায়ও একইভাবে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এ সম্পর্কে বিল উত্থাপন করার সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রী রাজ্যসভায় সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হওয়ায় বিরোধী সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে একটা বার্তা গেছে। সেটা হলো তারা বুঝতে পারবে, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ। লোকসভায় একইভাবে বিলটি পাস হলে বাংলাদেশের কাছে আরো একটা ভালো বার্তা পৌঁছাবে।
মোদীর কৃতজ্ঞতা
প্রধানমন্ত্রী মোদী বিল পাসের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, আসামের তরুণ গগৈ, ত্রিপুরার মানিক সরকার, মেঘালয়ের মুকুল শংমা এবং মিজোরামের লালথানহাওয়ালাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। লোকসভায় বিলটি পাসের পর মোদী কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীসহ পার্লামেন্টে দলটির নেতা মল্লিকার্জুন খার্গের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে ধন্যবাদ জানান। এরপর মোদী পার্লামেন্টে বিরোধী নেতা এআইএডিএমকে প্রধান জে জয়ললিতা, ডিএমকে প্রধান এম করুণানিধি, সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, বিএসপি নেতা মায়াবতী, সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়েম সিং যাদব, বিজেডি নেতা বিজু পাটনায়েক এবং জেড (ইউ) নেতা শারদ যাদবকে ফোন করে ধন্যবাদ জানান। এরপর এক টুইটার বার্তায় বিরোধী সকল নেতাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে প্রতিবেশীর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে জাতির সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হলো।
যা বললেন সুষমা স্বরাজ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেকে সমালোচনা করেন যে, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিগ ব্রাদারের (বড় ভাই) ভূমিকা পালন করে। সেটা আসলে সত্যি নয়। ভারত মূলত প্রতিবেশীর সঙ্গে এল্ডার ব্রাদার (সহোদর ভাই) হিসেবে ভূমিকা রাখে। বড় সহোদর ভাইয়ের মতই ভারত তার প্রতিবেশীর সঙ্গে স্নেহসুলভ আচরণ করে। লোকসভার এক সদস্য যখন রহস্য করে বলেন, বিগ ব্রাদার নাকি বিগ সিস্টার? তখন সুষমা স্বরাজ হেসে বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি পুরুষ, স্ত্রী নন।
সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের ৮০ শতাংশে কোন সমস্যা নেই। সীমানা চিহ্নিত করা এবং বেড়া দেয়া আছে। এই বিল চূড়ান্ত হওয়ার পর বাকি সীমান্তও চিহ্নিত হবে এবং অনুপ্রবেশ বন্ধ করা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যেভাবে নৌ-সীমান্ত এবং স্থল সীমান্ত সমস্যার সমাধান হচ্ছে একই গতিতে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সমস্যার সমাধানও হবে।
নাটকীয় পরিবর্তন
আসাম বিজেপির পক্ষ থেকে স্থল সীমান্ত চুক্তির বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতার মুখে চুক্তি থেকে আসামের ছিটমহলগুলো বাদ দেয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিবেচনা করছেন বলে এর আগে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর স্থল সীমান্ত চুক্তি থেকে আসামকে বাদ না দিতে মোদীকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ। আসামকে বাদ দিলে রাজ্যসভায় এ বিল পাসে সমর্থন দেয়া হবে না বলে ইঙ্গিতও দিয়েছিল কংগ্রেস, যারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই বিল পার্লামেন্টে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপরই অপরিবর্তিত অবস্থায় বিলটি পাসের ব্যাপারে আশার আলো দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত সোমবার রাতে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহর বাসভবনে এক বৈঠকে আসামকে রেখেই প্রস্তাবটি পাসের জন্য তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী মোদীর সভাপতিত্বে মঙ্গলবার ভারতের মন্ত্রিসভা সংবিধান সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন করে। কাল শুক্রবার লোকসভার চলতি অধিবেশন শেষে চীন, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। এরপর জুন বা জুলাইয়ে বাংলাদেশে আসতে চান তিনি। তবে ভারতীয় কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘খালি হাতে’ ঢাকা সফরে যাওয়া মোদীর ‘ঠিক হবে না’। এ কারণে লোকসভার চলতি অধিবেশনেই বিলটি পাস করিয়ে আনতে মোদীর এই তাড়াহুড়ো। এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এসেই প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেন। সকল বিরাজমান বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেন। স্থল সীমান্ত চুক্তিতে মূলত আশার আলো দেখা যায় গত বছর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বৈঠকে। ওই বৈঠকেই মোদী শেখ হাসিনাকে স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি
ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে পরিচিত ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে প্রটোকলে স্বাক্ষর করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। বাংলাদেশ ওই চুক্তিতে অনুসমর্থন দিলেও জমি হস্তান্তরে ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি আটকে থাকে। ভারতের বিগত কংগ্রেস সরকার কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও বিজেপি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতায় রাজ্যসভা ও লোকসভায় তা পাস করাতে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসাবে ৬৮ বছর ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেন। শুরু থেকে আপত্তি করে আসা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাও নানা চাপের মধ্যে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সীমান্ত চুক্তি ও এর প্রটোকল বাস্তবায়িত হলে কয়েক দশকের পুরনো সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়ার পাশাপাশি সীমান্তে আসবে শান্তি। ছিটমহলের বাসিন্দাদের গত সাত দশকের মানবিক সংকটের অবসান ঘটবে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার বাস্তবায়নের সুযোগ হবে তাদের। একই সঙ্গে খুলবে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত। দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় এবং সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিত করাই এই স্থল সীমান্ত চুক্তির লক্ষ্য। সাড়ে ৬ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা চিহ্নিত করা হবে। ছিটমহলগুলোর মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি (৭ হাজার ১১০ একর জমি) এবং বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ১১১টি (১৭ হাজার ১৬০ একর) জমি বিনিময় হবে। ৫১টি ছিটমহলে বাসিন্দা আছে ১৪২১৫ জন এবং ১১১টি ছিটমহলে বাসিন্দা আছে ১৪২১৫ জন। অপদখলীয় জমি রয়েছে ৫০৪৪ একর। এর মধ্যে বাংলাদেশের কাছে থাকবে ২২৬৭ একর এবং ভারতের কাছে যাবে ২৭৭৭ একর।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত সমস্যার সমন্বিত সমাধানে পৌঁছার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ১৯৫৮ সালের নেহেরু-নুন চুক্তি এবং ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে সীমানা জটিলতার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওই দুই চুক্তিতে প্রায় ৬.১ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমান্ত, ছিটমহল বিনিময় ও অপদখলীয় ভূমির বিষয়ে কোনো সমাধান ছিল না। ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী, দহগ্রাম-আঙ্গুরপোতা ছিটমহলে যাওয়ার জন্য ভারত বাংলাদেশকে তিন বিঘা করিডর শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়। ১৯৯২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সরকার বাংলাদেশকে তিন বিঘা করিডর ব্যবহারের সুযোগ দেয়। প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১২ ঘন্টা করে ব্যবহারের সুযোগ পায় বাংলাদেশিরা। ২০১১ সালের প্রটোকল অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর কোনো বাসিন্দাকেই নিজ বসতবাড়ি ও জীবিকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হবে না। ছিটমহলগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে উভয় দেশের প্রতিনিধিদল সেগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে ব্যাপক পরিসরে মতবিনিময় করেছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৬৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস হওয়ায় তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করলেই সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।