দুই মহারাজের কারণেই ছিটমহল

 
ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত ভারতে কোচবিহারের মহারাজা ও রংপুরের মহারাজা তাদের জমিদারির খাজনা ইংরেজদের দিতেন না। ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই খাজনা দেওয়া থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন এই দুই মহারাজ। পরে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের প্রাক্কালে ভারত ও তত্কালীন পাকিস্তানের মানচিত্র অঙ্কন করার সময়ও দুই মহারাজার জমি পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়। দেশ বিভাগের সময় কোচবিহার মহারাজার জমিদারিতে বসবাসকারীরা ভারতের সঙ্গে বসবাসের ইচ্ছা পোষণ করে। অন্যদিকে রংপুর মহারাজার জমিতে বসবাসকারীরা পাকিস্তানের সাথে থাকতে চান। কিন্তু কোচবিহার মহারাজার কিছু জমি রংপুর মহারাজার জমির ভিতরে পড়ে যায়। একই ভাবে রংপুর মহারাজার কিছু জমি কোচবিহার মহারাজার জমির ভিতর পড়ে যায়। ফলে দুই দেশ পৃথক হওয়ার সময় জমির ক্ষুদ্র অংশগুলো থেকে ‘ছিটমহল’ তৈরি হয়।
 
দেশ বিভাগের সময় তত্কালীন পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজটি সম্পন্ন করতে হয়েছিল। মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে কাজটি করা হয়। স্যার র্যাডক্লিফ ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে দিল্লিতে পৌঁছান এবং ১৩ আগস্ট তার রিপোর্ট পেশ করেন। দীর্ঘকালের যোগাযোগ ব্যবস্থা, সমন্বিত অর্থনীতি ও স্থিতিসম্পন্ন অখন্ড এলাকার মাঝ বরাবর সানন্দে দাগ টেনে দেয়া হয়। ফলে দুই নতুন সার্বভৌম দেশের সীমারেখার এপারে ওপারে, ব্রিটিশ-ভারতের পূর্ব-পশ্চিমে দুই অঞ্চলের দুটি প্রদেশ বাংলা ও পাঞ্জাব, প্রত্যেকটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৬ আগস্ট সীমারেখা নির্ধারণী টপো-শিটের মূলকপি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। এ রায় যে বিতর্কের বিষয় হবে তা কমিশনেরও নিশ্চিত জানা ছিলো। কাগজে সীমানা যেভাবেই দাগানো হোক না কেন, মৌজা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি পারিবারিক বা গোষ্ঠীগত কারণে এবং জমি-জমার মানচিত্রে অসঙ্গতির কারণে বহু স্থানেই র্যাডক্লিফ যেভাবে দাগিয়েছিলেন, বাস্তবে সীমানা সেভাবে নির্ধারিত হওয়া সম্ভব ছিল না। কমিশনের সদস্যদের নিষ্ক্রিয় পরিস্থিতিতে জমিদার, নবাব, স্থানীয় নেতা এবং এমনকি চা বাগানের মালিকরা বাংলা বিভক্তিকে কেন্দ্র করে তাদের নিজস্ব স্বার্থানুকূল রায়ের জন্য প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৪৭ সালে এভাবে ব্রিটিশের হাতে ভারত বিভাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ওপর ছিটমহল সমস্যা বর্তেছে।
 
পাক-ভারত বিভক্তির সময় গঠিত বাউন্ডারী কমিশন এসব জমি ব্যতিরেকেই দুই দেশের সীমানা নির্ধারণ করে। ফলে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে দুই দেশের মহারাজার ১৬২ টি জায়গায় জমি থেকে যায়। এর মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের কোচবিহার মহারাজা শ্রী শ্রী নারায়ণ ভুগ বাহাদুরের  ১১১টি জায়গায় জমি থেকে যায়। আবার ভারতের অভ্যন্তরে রংপুরের মহারাজা গোপাল লাল রায়ের ৫১টি জায়গায় জমি থাকে। দুই দেশের মহারাজের ব্যক্তিগত জমি হওয়ার কারণে কোন দেশই এই জমির মালিকানা পায় না। পরবর্তিতে এসব জমিগুলো এক একটি ছিটমহল হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহলগুলোর অবস্থান হলেও এখানকার বাসিন্দারা হয়ে যায় ভারতীয় নাগরিক। একইভাবে ভারতের অভ্যন্তরে পূর্ব পাকিস্তানের ছিটমহলগুলোর বাসিন্দারা পাকিস্তানী নাগরিক হয়ে থেকে যায়।
 
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় কমিটি বাংলাদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির পরই ভারতে জমিদারী ও রাজা প্রথা বাতিল করে দেয় সরকার। সে সময় কোচবিহারের মহারাজা চেয়েছিলেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া তার সকল জমি ও সেখানে অবস্থানরতদের ভারতের সাথে থাকতে। কিন্তু তখনকার তার প্রজারা পূর্ব পাকিস্তানে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেন। মহারাজা নিজে থেকে যান ভারতে।
 
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৪ জেলার মধ্যে পড়ে কোচবিহার মহারাজার ১১১টি ছিটমহল। এসব ছিটমহলের মধ্যে পঞ্চগড় জেলায় পড়েছে ৩৬টি। এছাড়া লালমনিরহাটে ৫৯টি, কুড়িগ্রামে ১২টি এবং নীলফামারীতে ৪টি ভারতীয় ছিটমহল রয়েছে।
 
১৯৫৮ সালের নেহেরু-ফিরোজ খান নূন চুক্তি অনুযায়ি বেরুবাড়ীর উত্তর দিকের অর্ধেক অংশ ভারত এবং দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর সংলগ্ন এলাকা পাবে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হলেও পরে তা মুখ থুবড়ে পরে। ফলে বেরুবাড়ীর দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর ছিটমহলের সুরাহা হয়নি। ১৯৫৮ সালের এই চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের উল্লেখ থাকলেও এ ব্যাপারে ভারতের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি সে দেশের সংবিধানের ১৪৩ ধারা (রাষ্ট্রের অখন্ডতা) সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান। তখন আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে। পরে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনীর বিষয়টি বেশি দূর এগোয়নি। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজ দেশের পক্ষে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সেখানেও ছিটমহল বিনিময়ের কথা উল্লেখ করা হয়।
 
২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের সাথে স্থল সীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করেন। প্রটোকলে বলা হয়, বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল যার অধিবাসী ৩৭,৩৩৪ এবং ভারতের ভূখন্ডের ভিতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল যার জনসংখ্যা প্রায় ১৪,২১৫ জন। ভারতীয় সীমানায় অবস্থিত বাংলাদেশের ছোট ছোট ছিটমহলের ওপর বাংলাদেশের শাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই, এসব জায়গার কোনো রকম উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনাও সম্ভব নয়, যদিও ওই সকল ছিটমহলে বসবাসকারী সকল মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সাংবিধানিকভাবেই বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ নাগরিক অধিকারের হকদার।