‘মঞ্চ শিল্পীদের জন্য একটা বেতন কাঠামো দরকার’

দেশবরেণ্য নাট্যজন আতাউর রহমান। নিজের নাট্যচর্চার বাইরে একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক হিসেবেও তার সুখ্যাতি। নিজের দীর্ঘ সাধক জীবনের প্রতিফলনেই চ্যানেল আই রবীন্দ্র মেলায় আজীবন সম্মাননা পেলেন তিনি। বর্তমান রবীন্দ্র ও নাট্যচর্চা নিয়ে কথা বললেন বিনোদন প্রতিদিনের সাথে।

 
আপনি রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন, আপনার অনুভূতি জানতে চাচ্ছি?
 
পুরস্কার সব সময়ই আনন্দদায়ক। ভালো কাজের স্বীকৃতি হচ্ছে পুরস্কার। একুশে পদকসহ এখন পর্যন্ত অনেক স্বীকৃতি পেয়েছি। আমি মরণোত্তর পুরস্কারে বিশ্বাসী নই। বেঁচে থাকতেই নিজের কাজের মূল্যায়ন দেখে যেতে চাই। আমি খুশিতে আপ্লুত এজন্য যে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনীতে অভিনয় করে কবির জন্মজয়ন্তীতে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পেলাম। তাই এই স্বীকৃতি আমার কাছে অন্যরকম পাওয়া।
 
আপনার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে কবিগুরুর প্রভাব কতটুকু?
 
হ্যাঁ, আমি কবিগুরুর অনেক নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি মঞ্চ নির্দেশনা দিয়েছি। ‘অচলায়তন’, ‘রক্ত করবী’, ‘তাশের দেশ’সহ অনেক কাজ আছে আমার করা। ‘হৈমন্তী’ ছোটগল্প অবলম্বনে তৈরি নাটকে অপুর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেও পুরস্কার পেয়েছি। সব মিলিয়ে আমার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে কাজের প্রতি সার্বিক উত্সাহ ও শক্তি জুগিয়েছেন কবিগুরুর প্রেরণা।
 
মঞ্চ থেকে এখন আর আগের মতো শক্তিশালী অভিনেতা-অভিনেত্রী আসছে না, কেন?
 
মঞ্চ হচ্ছে অভিনয়ের সুতিকাগার। মঞ্চের শিক্ষাই বড় শিক্ষা। তার জন্য দরকার মঞ্চে নিয়মিত অভিনয় করা। দু’একটা মঞ্চ নাটকে কাজ করেই অভিনয় শেখা যায় না। অভিনয় একটা শিল্প। মন-প্রাণ উজাড় করে অভিনয় করে যেতে হয়। কিন্তু এখনকার শিল্পীরা মঞ্চে স্থায়ী হতে পারছে না। অন্যান্য কাজের দিকে তারা ঝুঁকে পড়ছে। তাই মঞ্চ থেকে আগের মতো শিল্পী বের হতে পারছে না।
 
শিল্পীরা মঞ্চে স্থায়ী হতে পারছে না কেন?
 
অভিনয়ও একটা পেশা। মঞ্চে অভিনয় করে শিল্পীদের অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে, তাই তারা মঞ্চে  নিয়মিত হতে পারছে না। এটা একটা বড় কারণ। আরও ছোট ছোট অনেক কারণ তো রয়েছেই।
 
সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়ে আপনারা কী ভাবছেন?
 
সব সমস্যাই সমাধান যোগ্য। মঞ্চ শিল্পীদের জন্য একটা বেতন কাঠামো দরকার। শিল্পীরা যদি মঞ্চে অভিনয় করে কিছু অর্থ-কড়ি পায় তাহলে আর অন্য কাজের দিকে ছুটতে হবে না। এর জন্য দরকার সরকারের সহযোগিতা। এতে করে তরুণরা এখানে এসে কয়েকদিনের মধ্যেই হতাশায় পড়বে না। তাতে আমাদের সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসার বাড়বে।
 
একজন গুণী অভিনয় শিল্পীই এখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, ওনার সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন?
 
ঠিক বলেছেন। আসাদুজ্জামান নূর একজন গুণী অভিনয় শিল্পী। তিনি তো মাত্র অল্প কিছুদিন হলো এই দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি জানেন কিভাবে সমস্যা সমাধান করতে হবে। এরইমধ্যে কিছু অনুদান দিয়েছেন। বেসরকারি অনেক মহল ও আমাদের অনুদান দিচ্ছে। মন্ত্রী আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থায়ী সমাধানের জন্যও তিনি আলোচনা করছেন। আশা করি খুব শিগগিরই একটা সমাধান পাবো।
 
মঞ্চ নাটকে আগের মতো দর্শক দেখা যায় না, তাহলে কি মঞ্চ নাটক গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে?
 
না, মঞ্চ নাটক চিরদিন তরুণ। এই যান্ত্রিক শহরে ইচ্ছে করলেই মানুষ মঞ্চ নাটক উপভোগ করতে পারে না। পাঁচ ঘণ্টা জ্যাম ঠেলে মানুষ কিভাবে নাটক দেখবে! একটা শিল্পকলা একাডেমি আর ছায়ানট দিয়ে হবে না। ঢাকা শহরে আরও আট থেকে দশটি মঞ্চ নির্মাণ করতে হবে। তাছাড়া ঢাকার বাইরেও মঞ্চ নির্মাণ করতে হবে। তাহলে মঞ্চ আবার দর্শকপূর্ণ হবে।
 
এখন টিভি নাটকে মঞ্চ থেকে নয়, মডেলিং থেকে এসে অভিনয়ের জায়গা পূরণ করছে, এদের প্রতি আপনার মূল্যায়ন কী? 
 

নতুনরা দেখতে সুন্দর। কিন্তু গভীর অভিনয় করতে হলে শিখতে হবে। এখন তো রাতারাতি লাক্স সুপারস্টার হওয়া যায়। আবার দেখা যায় কিছুদিন পরে খবর নেই। একটা কথা মনে রাখতে হবে, ‘তারার মৃত্যু আছে, অভিনেতার মৃত্যু নেই’। তাই আমি বলবো যারা মডেলিং থেকে অভিনয়ে এসেছে তাদের ভালো করে অভিনয় শিখতে হবে। তা-না হলে টিকে থাকতে পারবে না। প্রতিযোগিতার এই সময়ে যোগ্যতা দিয়েই টিকে থাকতে হবে।