বাজেটে করের আওতা বাড়ছে: অর্থমন্ত্রী

আসছে বাজেটে করের আওতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল বুধবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সভায় তিনি বলেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ১১ লাখ করদাতা। আরো ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে করের আওতায় আনতে হবে। আমি চাই অর্ধেক মানুষ করের আওতায় আসুক। এটি হয়তো চরমপন্থা হয়ে যাবে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালে এটি যথাক্রমে ৩২ শতাংশ ও ২২ শতাংশ। আমাদেরও সে পথে যেতে হবে।

 
প্রতিবছর বাজেটের আগে বাজেট প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষ রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই যৌথভাবে বাজেট নিয়ে পরামর্শক কমিটির সভা করে থাকে। বাজেটের আগে ব্যবসায়ীদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় সভা। এ সভায় ব্যবসায়ীরা অর্থমন্ত্রীকে সরাসরি তাদের প্রস্তাব ও দাবি জানানোর সুযোগ পান। গতকাল এ পরামর্শক কমিটির ৩৬তম সভায় এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে মূল দাবি তুলে ধরেন। এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় এ সময় অন্য ব্যবসায়ী নেতারাও তাদের বক্তব্য ও দাবি তুলে ধরেন।
 
অর্থমন্ত্রী দেশীয় উত্পাদনকারীদের আমদানি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থার উপর নির্ভর না থেকে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থায় কিছু সংকট আছে। তবে আমদানি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থা থেকে আদায় কমাতে হবে।
 
অন্যদিকে আগামী বছর থেকে শুল্ক খাতে আয় কমলেও সার্বিক রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। অর্থাত্ সরকারকে আয়কর ও ভ্যাট আরো বাড়াতে হবে। এ পরিস্থিতিকে ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিষয়টি সহ্য করে নেয়ার আহ্বান জানান।
 
বর্তমানে ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদধারীদের প্রদেয় করের উপর বিভিন্ন হারে সারচার্জ (মাশুল) দিতে হয়। এটিকে আগামী বছর থেকে প্রোপার্টি ট্যাক্স (সম্পত্তি কর) হিসেবে চালু করার চিন্তা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তবে ভারত দীর্ঘদিন পর প্রোপার্টি ট্যাক্স প্রথা বাতিল করেছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আরো চিন্তা করার জন্য এনবিআরকে নির্দেশ দেন।
 
এ সময় বিগত কয়েক বছরে আয়করে সরকারের সাফল্য তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। বড় বাজেটের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বড় বাজেট না হলে সেবা দেব কী করে? টানা দ্বিতীয় মেয়াদে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয়বার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে জিডিপিতে রাজস্বের অবদান ১১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর মধ্যে গত ছয় বছরে বেড়েছে ৩ শতাংশ। আর এর আগের তিন শতাংশ বৃদ্ধি করতে ২৭ বছর সময় লেগেছিল। আগামী চার বছরে জিডিপিতে করের অবদান আরো অন্তত ৩ শতাংশ বাড়াতে চান তিনি।
 
সিগারেট ফোঁকাকে বিনোদন হিসেবে নিয়েছে মানুষ
 
আলোচনার এক পর্যায়ে তামাকের কর বিষয়ে তিনি বলেন, আগে কোম্পানির সাথে বসে মান অনুযায়ী এর উপর বিভিন্ন স্তরে শুল্ক-করের হার ঠিক করে দিতাম। এবার এটা বাজারের উপর ছেড়ে দিতে চাই। অন্যান্য দেশে যেভাবে ধার্য করা হয় সেভাবেই ধার্য করা হবে।
 
বিনিয়োগবান্ধব বাজেটের দাবি
 
এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে আগামী বাজেটকে বিনিয়োগবান্ধব করতে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, শিল্প  ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করা হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। বিনিয়োগের মূল বাধা হচ্ছে দুর্বল অবকাঠামো। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানির অপর্যাপ্ততা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্প প্লটের অপর্যাপ্ততা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে। এসব সংকট দূর করার তাগিদ দেন তিনি। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিশেষ’ কর সুবিধা দেয়ার বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানান। বাস্তবায়ন ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বাজেটের আকার নির্ধারণের তাগিদ দেয় এফবিসিসিআই।
 
আগামী বছরের এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি হচ্ছে উল্লেখ করে এডিপি বাস্তবায়নযোগ্য সীমায় আনার প্রস্তাব করা হয়। সেই সঙ্গে মেগা প্রকল্পসহ সব ধরনের প্রকল্পের ব্যয় এবং কাজেট গুণগত মান উন্নয়নেরও তাগিদ দেয়া হয়।
 
এ সময় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিষয়ে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। আয়কর বিষয়ে ১৪২টি, ভ্যাট নিয়ে ১২৭ ও শুল্ক বিষয়ে ৩১৮টি নিয়ে মোট ৫৮৭টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
 
ইন্দো-বাংলা চেম্বারের সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, বাজেট আসলে আতঙ্ক তৈরি হয়। কারণ কর আদায়কারীরা বাজেটের চেতনা অনুসরণ করেন না।
 
কৃষিঋণ পুন:তফসিলের সুযোগ
 
দেয়া হতে পারে
 
রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণ পুন:তফসিলের সুযোগ দেয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আসছে বাজেটে এ বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। গতকাল সচিবালয়ে চ্যানেল আইয়ের হূদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে কৃষি বাজেট সংক্রান্ত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় ৫৭ দফা সুপারিশমালা উপস্থাপন করেন চ্যানেল আইয়ের বার্তা বিভাগের প্রধান শাইখ সিরাজ। হরতাল-অবরোধে পণ্য বাজারজাত করতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ কথা ঠিক হরতাল-অবরোধের কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে কি না এ বিষয়ে আমি এখনো কিছু ঠিক করিনি। তবে কৃষি ঋণ রি-সিডিউল (পুনঃতফসিল) করা হতে পারে বলে জানান তিনি। অনুষ্ঠানে শাইখ সিরাজ বলেন, এবারের কৃষি বাজেট আলোচনায় কৃষকদের একটি প্রধান দাবি ছিল কৃষি ঋণ মওকুফ করা। কারণ হরতাল-অবরোধের কারণে গত তিন বছর ধরে কৃষকরা তাদের পণ্য বাজারজাত করতে পারেনি।

আগামী বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকীর বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন আসছে না।