প্রশান্তদের পা ফিরে পাওয়ার মধুর আনন্দ

প্রশান্ত সিংহের বয়স ৮ বছর। বাড়ি কুমিল্লা সদর দক্ষিণে। ফুটফুটে এই শিশুর এই বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা। লাফালাফি করে পাড়া মাতিয়ে রাখার কথা। তবে বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা। ২০১৪ সালের এক শান্ত সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রাকের চাপায় দুই পা হারায় প্রশান্ত। বাবা মানিক সিংহ খেটে খাওয়া মানুষ। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। এমন অবস্থায় ছেলের কৃত্রিম পা লাগানোর কথা ভাবতেও পারেননি। তবে গরিবের স্বপ্ন এবার পূরণ হয়েছে। স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এসেছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)।

 
‘বিনামূল্যে কৃত্রিম পা সংযোজন ক্যাম্প-২০১৫’তে এসে দুই পা ফিরে পেয়েছে প্রশান্ত। সে অন্যরকম এক দৃশ্যের অবতারণা। প্রশান্তের চোখেমুখে তৃপ্তির আভা। খুশির ঝলক। বাবা মানিক সিংহের চোখের কোণে চিকচিক করছে পানি। প্রশান্ত বললেন, আমি খুব খুশি। আবার স্কুলে যেতে পারবো। 
 
ভারতের ভগবান মহাবীর বিকলাঙ্গ সহায়তা সমিতির (বিএমএসএস) সহায়তায় ৭ মে থেকে শুরু হওয়া এ ক্যাম্পের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটি। ২৪ মে পর্যন্ত এ কর্মসূচিতে বিনামূল্যে ৬০০টি কৃত্রিম পা সংযোজন করা হবে।
 
একটু পিছনে ফেরা। রোনাল্ড জোসেফ গাস্টের জন্ম আমেরিকার ওকলাহমা স্টেটে। স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও আহত জনগণের চিকিত্সা সেবার নিমিত্তে মাত্র একজন অর্থোপেডিক সার্জন রয়েছেন, এ ব্যাপারটি তাকে ভাবিয়ে তোলে। ১৯৭২ সালের  জুন মাসে ডা. গাস্ট সস্ত্রীক ঢাকায় চলে আসেন। বাংলাদেশ সরকার ও স্বেচ্ছায় শ্রম প্রদানে আগ্রহী স্টাফদের সহযোগিতায় শেরে-বাংলানগরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বারান্দায় ১০০ শয্যার একটি অর্থোপেডিক ইউনিট চালু করেন। পরবর্তী সময়ে এই ইউনিটটি ২৫০ এবং তারও পরে ৩৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। পরে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ১৯৭৮ সালে ৪০০ শয্যার পঙ্গু হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভবন তৈরি হলে সকল রোগী ওই হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয় এবং ডা. গাস্ট প্রকল্প পরিচালক  পদে যোগ দেন।
 
ওই সময় লিম্পো সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে কৃত্রিম হাত, পা সংযোজন করানো হতো। অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। এটি হঠাত্ করে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে রানা প্লাজার ঘটনার সময় লিম্পো সেন্টারের কদর বেড়ে যায়। তখন এটি আবার চালু করা হয়। এটি বন্ধ হওয়ার নেপথ্যে কারণ ছিল চিকিত্সকরা বেসরকারি হাসপাতালে বসতেন। এতে করে গরিব মানুষ অসহায় অবস্থায় পড়ে যায়। কেননা বিত্তশালীরা অধিক ব্যয়ে কৃত্রিম হাত পা সংযোজন করতে পারলেও বিপাকে পরে যায় গরিবরা।
 
তবে এবারের ক্যাম্পে এসে হাত, পা ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা সবাই। কথা হয় এমন কয়েকজনের সঙ্গে। ছোট্ট ছেলে আপন। পায়ের গুরুত্বই বোঝে না ছেলেটা। বাবা ফিরোজ মিয়া তাঁতের কারিগর। বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। অভাবের সংসার। ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ট্রাকের চাপায় দুই পা হারায় আপন। একমাত্র ছেলে আপন ক্যাম্পে এসে দুই পা ফিরে পেয়েছে। হাঁটতে পারায় অন্যরকম খুশি সে।
 
আমিরুল ইসলামের বয়স ৩৬ বছর। বাড়ি নীলফামারী সদরে। পিকআপ ভ্যান চালাতেন। গত বছরের রমজানে ময়মনসিংহে এক দুর্ঘটনায় ডান পা হারান আমিরুল। সংসারে অন্ধকার নেমে আসে। কী করবেন কিছুই বুঝতে পারেন না। তবে এখন কৃত্রিম পা সংযোজনের পর চা দোকান দিয়েছেন আমিরুল। ফের সংসারে সচ্ছলতার সুবাতাস বইতে শুরু করেছে সংসারে।
 
সুমন আলী। বয়স ২৮ বছর। বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে। ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারান। এক সময় সবজি ব্যবসা করতেন। নতুন পা সংযোজনের পর চা দোকান দিয়েছেন। বেশ ভালো আছেন।
 
মাকসুদা বেগম। বয়স ৩৫ বছর। স্বামী সোবহান হাওলাদার। বাড়ি মাদারীপুরের শিলের চরে। ডান পা কেটে গেছে এক দুর্ঘটনায়। এখন পা ফিরে পেয়ে বেশ ভালো আছেন।
 
মিতু বেগমের বয়স ২৫ বছর। পেশায় ছিলেন গার্মেন্টস কর্মী। ২০১১ সালে ফার্মগেটের খামারবাড়ি এলাকায় অফিস থেকে ফেরার পথে গাড়িতে চাপা পড়ে বাম পা হারান। স্বামী মোস্তফা কাজ করেন না। এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন মিতু। টুকটাক কাজ করতে পারেন এখন।