নদের ভেতরেই উঁচু করে রাখা হচ্ছে মাটির স্তূপ। সামান্য বৃষ্টি হলেই এ মাটি ধসে ভরাট হবে নদ। এর জের ধরে চলতি বছর কপোতাক্ষ তীরে দেখা দেবে জলাবদ্ধতা। এ আশঙ্কা প্রকাশ করলেন কপোতাক্ষ তীরের বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী সামছের আলী। তার মতে, বর্ষা মৌসুমে এলাকার পানি পূর্বে কিছুটা নিষ্কাশন হলেও এবার হবে না। এলাকায় দেখা দেবে স্থায়ী জলাবদ্ধতা।
প্রতিবছর কপোতাক্ষ নদ খননের সময় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা মাটি সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে খনন কাজ শেষ করেন। কিন্তু পরে তারা আর ওই মাটি অপসারণ করেন না। যে কারণে প্রতিবছরই একই স্থানে খনন করতে হয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। বর্তমানে সাতক্ষীরার তালা উপজেলা অংশে কপোতাক্ষ নদ খননের কাজ চলছে।
গত শনিবার সরেজমিনে তালা উপজেলার মোবারকপুর, মাগুরা, বারুইপাড়া, মেলাবাজার, চরগ্রাম, ইসলামকাটি ও চাঁদপুরসহ কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায় কপোতাক্ষ নদের কোথাও এক পাশে, কোথাও দুই পাশে খনন করা হচ্ছে। খননের পর মাটি নদের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানির মধ্যে খনন করা হচ্ছে। কয়েকটি খনন যন্ত্র (এক্সাভেটর) এ কাজ করছে। আবার কোথাও কোথাও মাটি আরো একটু দূরে অপসারণ করে রাখা হচ্ছে।
তালা উপজেলার মাগুরা গ্রামের এলাহি বক্স জানান, কপোতাক্ষ নদ যেভাবে খনন করা হচ্ছে তাতে কোন কাজ হবে না। বছর যেতে না যেতেই ভরাট হয়ে যাবে। কারণ খননকৃত মাটি নদের ভেতরে রাখা হচ্ছে। প্রতিবছরই তারা খননকৃত মাটি অপসারণের কথা বললেও সেটি করা হয় না।
কপোতাক্ষ নদের উত্পত্তি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার তাহেরপুরে। এরপর চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরার বেশ কয়েকটি স্থান হয়ে এটি খুলনার পাইকগাছার শিববাড়ির কাছে শিপসা নদীর ত্রি-মোহনায় মিশেছে। নদটির দৈর্ঘ্য প্রায় দুইশ’ কিলোমিটার।
যশোর পাউবো দপ্তর থেকে জানা গেছে, ২০১১ সালের জুলাই মাসে কপোতাক্ষ নদ খননে চার বছর মেয়াদী প্রায় ২৬২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ২১ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার খননে ৬১ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। চলতি বছরও একই বরাদ্দে মূল নকশা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ চলছে।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ জানান, কপোতাক্ষ খননে শুরু থেকে লুটপাট শুরু হয়েছে। নদটি খনন করে নদের ভেতরে মাটি উঁচু করে রাখা হচ্ছে। এতে কপোতাক্ষ তীরে এবার স্থায়ী জলাবদ্ধতার আশংকা রয়েছে।
তালা উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামের সাদ্দাম হোসেন বলেন, কপোতাক্ষ নদ খননে আগেও লুটপাট হয়েছে, এবারও হচ্ছে। পাউবো কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা কপোতাক্ষকে দুধের গাভী হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি আরো বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা কাজ তেমন তদারকি করেন না, ফিল্ডেও ঠিকমতো আসেন না। এজন্য ঠিকাদাররা সুযোগ পেয়ে কাজে অনিয়ম করে। একই গ্রামের নিমাই দেবনাথ বলেন, নদ খনন করে মাটি যেভাবে রাখা হচ্ছে, এতে এলাকার পানি নিষ্কাশনে বাঁধাগ্রস্ত হবে।
খনন যন্ত্র (এক্সাভেটর) চালক মিজানুর রহমান বলেন, খনন করে মাটি নদের তীরে রাখা হচ্ছে। পরে এ মাটি অপসারণ করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী খনন হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিকাদার যেভাবে বলেছে, সেভাবে খনন করছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ তদারকি কর্মকর্তা (এসও) মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, খনন কাজে কোনো প্রকার অনিয়ম হবে না। ফিল্ডে না আসার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেন, মাটি উঁচু করে রাখলেও সমস্যা নেই। পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপের ব্যবস্থা আছে। ওই পাইপ দিয়ে পানি নিষ্কাশন হবে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অখিল কুমার বিশ্বাস বলেন, খননকৃত মাটি রাখার তেমন জায়গা নেই। এ কারণে তীরের পাশ দিয়ে রাখা হচ্ছে। ওই মাটি অপসারণের কথাও আমরা চিন্তা করছি।