ফাঁসিতে ঝুলতেই হবে মুরসিকে?

 
মিসরের দীর্ঘদিনের একনায়ক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পর মুরসি ছিলেন দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। তবে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা হয়নি মুরসির। মাত্র দুই বছরের মাথায় ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ২০১৩ সালে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন মোহাম্মদ মুরসি। এরপর থেকে দেশটিতে নিষিদ্ধ করা হয় মুসলিম ব্রাদারহুড সংগঠনটিকেও। গ্রেফতার করা হয় সংগঠনের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে। মুরসির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ব্রাদারহুডের শতাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত মাত্র এক জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এভাবে ‘পাইকারি’ মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় অনেকে ধারণা করছিল এসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে আসামিদের হয় ছেড়ে দেয়া হবে নয়তো বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে রাখা হবে।
 
কিন্তু চলতি সপ্তাহে মুরসির আরেক মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে একটি আদালত। ২০১১ সালে কারাগার ভেঙ্গে পালানোর অভিযোগে মুরসির সাথে আরো ১০০ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সময় পুলিশ সদস্যদের হত্যা ও অপহরণ, পুলিশের ওপর হামলা এবং কারাগার ভেঙ্গে পালানোর অভিযোগে মুরসি, ব্রাদারহুডের প্রধান মোহামেদ বাদেইসহ দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি করা হয়েছিলো। ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমান সামরিক সরকারের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে যেকোন মূল্যে ব্রাদারহুডকে নেতাশূন্য করে ছাড়বে তারা। একারণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে মুরসিসহ ব্রাদারহুডের শীর্ষনেতাদের।
 
মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকরা এ রায়কে ‘প্রহসন’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। বিচারক রায় পড়ে শোনানোর সময় অধিকাংশ আসামিই আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। আর লোহার খাচায় মোড়া কাঠগড়ায় উপস্থিত মুরসি মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে এ রায়ের প্রতিবাদ জানান। মুসলিম ব্রাদারহুডের কর্মকর্তা আমর দারাগ আদালতের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন এবং এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যদি রায় কার্যকর হয়, তবে সেটা হবে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক মহলের এটা বন্ধ করা উচিত।
 
মুরসির পতনের পর মিসর থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করা মুসলিম ব্রাদারহুডের জ্যেষ্ঠ নেতা মোহাম্মেদ সাউদান বলেন, আদালতে এভাবে বিচার করে মুরসির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয়াটা একেবারে হাস্যকর একটি ঘটনা। ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি মিসরের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়া সকলকেই দোষী সাব্যস্ত করেছে। এই রায় আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড পূরণে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এটা প্রহসনের রায় এবং এ রায় অবশ্যই ব্যর্থ হবে। 
 
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তায়িপ এর্দোগান মিসরের আদালতের এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, পশ্চিমারা যখন মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করছে সেখানে মিসরে একের পর এক মৃত্যুদণ্ডের রায় দেখেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। পশ্চিমারা এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপই নিচ্ছে না। এদিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই রায়ের সমালোচনা করে বলেছে, এটা হেঁয়ালি বিচার এবং অকার্যকর পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করেই বিচার কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, একেবারে অন্যায্য বিচারের মাধ্যমে মুরসির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়াটা সম্পূর্ণরূপে মানবাধিকার লঙ্ঘন। কয়েক মাস ধরেই তাকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে এমনকি তার পক্ষে একজন আইনজীবী পর্যন্ত দেয়া হয়নি।  
 
তবে মুরসির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে মিসরের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মতামত গ্রহণ করা হবে। মিসরের আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায় গ্র্যান্ড মুফতির কাছে পাঠানো হয়। গ্র্যান্ড মুফতি হলেন ইসলামী আইনের সরকারি ব্যাখ্যাদাতা। তিনি পরামর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকেন।
 
গত বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া দুটি মামলার প্রথমটির রায়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে গ্র্যান্ড মুফতির আদালত ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের পরামর্শ দিলেও মুরসিকে রেহাই দেয়া হয়। গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে মৃতুদণ্ড প্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের হামাস ও ইরানের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে মিসরকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ আনা হয়। তবে কারাগার থেকে পালানো মামলায় মুফতির চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ড অব্যাহত রাখা হলেও আপিল করার সুযোগ পাবেন মুরসি। গ্র্যান্ড মুফতির আদালত আগামী ২ জুন সিদ্ধান্ত জানাবেন। সুতরাং মুরসির মৃত্যুদণ্ড হবে কী হবে না তা অনেকটাই নির্ভর করছে গ্র্যান্ড মুফতির সিদ্ধান্তের ওপর।