‘বিনা খরচে নিয়ে যাব কাজ করে টাকা দিবা’

আপনার নগদ টাকা আছে কি না সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনোভাবে দেশের বাইরে নিয়ে আপনাকে বন্দী করে মুক্তিপণ দাবি করে ফোন করলে জমিজমা বিক্রি করে পরিবারের সেই টাকা দেয়ার সামর্থ্য কতটুকু সেটাই আসল কথা। এরপর গ্রামের সরলমনা কাউকে টার্গেট করে বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব দেবে দালালরা। ‘শিকার’ যদি আমতা আমতা করে তবে মালয়েশিয়া প্রবাসী কারো গল্প ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এমনভাবে বলবে যাতে সে মনে করতে পারে ওখানে টাকা আয় করার মতো সহজ কাজ আর কিছুই নেই। এমনকি ফাঁদে ফেলতে কখনো কখনো দালালরা বলে, যাবার টাকা না থাকলে সমস্যা নেই। মালয়েশিয়া গিয়ে কাজ করে পরে টাকা শোধ করো। এভাবে লোভ দেখিয়ে একবার ট্রলারে তুলতে পারলেই হলো।

 
লোভের বশে এভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের অর্ধশতাধিক যুবকের কোন খোঁজ নেই। দালালরা এসব যুবকদের স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা বুঝে নিলেও তাদের কোনো খোঁজ দিচ্ছে না। তাদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে নাকি মেরে ফেলা হয়েছে তাও জানাচ্ছে না। এমন অবস্থার মধ্যেও মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট এলাকার অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তরুণ-যুবকদের মালয়েশিয়া নেয়ার জন্য প্রলোভন দেখাচ্ছে।
 
জানা গেছে, কম টাকায় সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে ঘর ছাড়েন রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার এসব যুবক। এদের বলা হয়েছিল বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। টাকা পরে দিলে চলবে। নিখোঁজদের স্বজনরা জানান, রূপগঞ্জ উপজেলার কলাতলী এলাকার হাফিজউদ্দিনের ছেলে হারুন মিয়া, একই এলাকার জয়নাল, চান্দু মিয়ার ছেলে আরমান, কাঞ্চন, চৌধুরীপাড়া এলাকার মোহাম্মদ আলী, ভোলাবো এলাকার রমজান মিয়া, মতলিব মুন্সির ছেলে খোরশেদ, কেরাব এলাকার মোহাম্মদ আলী, নরসিংদীর আলিমউদ্দিন, আড়াইহাজারের শাহ আলী, কলাগাছিয়া গ্রামের সামসুল হকের ছেলে ইয়াকুব, কুমিল্লার কোতয়ালী থানার মোহাম্মদপুর দক্ষিণ আলীবাজার এলাকার সেকান্দার আলীর ছেলে খোরশেদ আলম মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য।
 
উপজেলার কলাতলী এলাকার সেরাজউদ্দিনের ছেলে মামুন মিয়া জানান, কাঞ্চন পৌরসভার কলাতলী এলাকার দালাল জয়নাল মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে ১ লাখ টাকা নেন। সাগরপথে যাবার কথা বললে ভয়ে তিনি রাজি হয়নি। টাকা ফেরত না দিয়েই জয়নাল একই এলাকা থেকে ৬-৭ জন যুবককে নিয়ে টেকনাফ চলে যান। সেখান থেকে তাদের মালয়েশিয়ার কথা বলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। মানবপাচারকারীদের প্রতি মানুষের ক্ষোভের আগুন সৃষ্টি হলেও জয়নাল দালাল কাউকে পরোয়া না করে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম দাবি করেন, দালালদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।
 
এনায়েতপুরের বাতাসে স্বজনদের কান্না
 
মানব পাচারকারী চক্রের উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঘাঁটি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের ৫ শতাধিক মানুষ মালয়েশিয়া পাচার হয়েছে। এর মধ্যে দালালদের নির্যাতনে কমপক্ষে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এনায়েতপুরের বিভিন্ন গ্রামের নিখোঁজ হওয়া লোকদের স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। পাচারকারী চক্র চাপের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও মামলা না করতে হুমকি দিয়ে চলেছে। সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচারে নিয়োজিত দালাল চক্রের অন্যতম ঘাঁটি এনায়েতপুরের রুপনাই, ব্রাহ্মণগ্রাম, খোকশাবাড়ি, চাঁদপুর, সোনাতলা, দ্বাদশপট্টি, ভাঙ্গাবাড়ি, গোপিনাথপুর, জুগিবাড়ি, রুপসী গ্রাম সহ অন্যান্য এলাকায় রয়েছে অর্ধশতাধিক দালাল। এরাই নানা কৌশলে উত্তরবঙ্গসহ টাঙ্গাইল এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সরলপ্রাণ মানুষকে পাচার করে আসছে। তবে বেশির ভাগ মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয় মালয়েশিয়ার কথা বলে।
 
তাঁত শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত কিংবা নিম্নবিত্ত এবং স্বল্প শিক্ষিত উঠতি বয়সীরাই প্রধান টার্গেট তাদের। প্রচুর বেতনে কাজের সুযোগসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ার কথা বলে এরা ট্রলারে তোলে। এভাবে দালালরা হঠাত্ করেই বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে যাচ্ছেন। এলাকাবাসী জানান, এখানকার পরিচিত দালালরা হচ্ছেন এনায়েতপুর থানার রুপনাই গাছপাড়া গ্রামের জেন্নত আলী মোল্লা, তার ভাই বিশু মোল্লা, মেয়ের জামাই শরিফ উদ্দিন, আব্দুল মোন্নাফ, নিজাম উদ্দিন, আব্দুল খালেক, তার ভাই পলাশ, আব্দুল মান্নান, তার সহযোগী রুপসী গ্রামের শ্বশুর মাহফুজ, ব্রাহ্মণগ্রামের আব্দুর রোউফ, আজমত আলী, ফজল হক, শাবু বেপারী, তার ছেলে রাসেল, আব্দুস ছামাদ, রহিম উদ্দিন, আইয়ুব আলী, খোকশাবাড়ির ছাদ্দাম ব্যাপারী, ফজলুল হোসেন, সোনাতলার ফরিদ, সহযোগী হজরত আলী মেম্বর, দ্বাদশপট্টি গ্রামের কালাম, আজুগড়ার সুজাব আলী, পাঁচিলের আবু তালেব, জুগিবাড়ির ছাবেদ আলী, রুপসীর আশরাফ আলী, চাঁনপুরের আব্দুর রশিদ, ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের হোসেন দালাল, গোপিনাথপুরের আব্দুল হালিম, খামারগ্রামের আলমাস দালাল। এর বাইরেও শতাধিক ‘সহযোগী দালাল’ রয়েছেন। এরা জন প্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে থাকেন।
 
দালালরা ট্রলারে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে লোকজনকে বন্দী করে পরিবারের কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আদায় করেন। ট্রলারে যাদের পাচার করা হয় তারা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। ছেলেকে বিদেশে পাঠানো বাবদ জালালপুরের আব্বাস আলীর পিতা কৃষি শ্রমিক হজরত আলী নিজ বাড়ি বিক্রি করে খোকশাবাড়ীর রোউফ দালালকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন আড়াই মাস আগে। তাকে ট্রলারে নেবার পথে নির্যাতন করে সাগরে ফেলে দেয়া হয়। একই ভাবে রুপসীর মহাদেব চন্দ্রকে পাচারের পর নির্যাতন করে দালাল ছাদ্দাম টাকা নিলেও তার হদিস দিতে পারছেন না।
 

সিরাজগঞ্জে মানব পাচারের ঘটনায় মোট ৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে এনায়েতপুরেই ৫টি। যার ২টির তদন্ত শেষে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।