দালালদের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশে যাবার চেষ্টাকালে সাগরে ভেসে বেড়ানোর কিংবা জঙ্গলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করার কথা এখন সবার মুখে মুখে। একই সাথে এসব মানব পাচারের সাথে জড়িত দালালদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করার খবরও আলোচনায় এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মানব পাচারকারী উখিয়ার উপকূলীয় এলাকার ফয়েজ মাছধরা জেলে থেকে কোটিপতি হয়েছেন। তিনি উখিয়া সদরে গাড়ি-বাড়িসহ অঢেল জমিজমার মালিক বনে গেছেন। কিন্তু তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কক্সবাজার ভিত্তিক এনজিও ‘হেলপ কক্সবাজার’ দাবি জানিয়েছে, অবৈধ উপায়ে আয় করা কোটি টাকার এসব সম্পত্তি জব্দ করে সর্বশান্ত পরিবারদের দেয়া হোক।
জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনারপাড়া থেকে মনখালী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার উপকূলীয় সাগর পথ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচারে জড়িত রয়েছে রোহিঙ্গাসহ ৩ শতাধিক স্থানীয় ও বহিরাগত দালাল। এরা বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফয়েজ আহামদ হাজারেরও বেশি স্থানীয় লোকজনকে পাচার করেছেন। উখিয়া সদর গালর্স স্কুল সংলগ্ন বটতলী এলাকায় কোটি টাকার জমি কিনে আরো কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ফয়েজের সাথে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। উখিয়া থানার ওসি জহিরুল ইসলাম খান বলেন, সাগর পথে আর যাতে মানব পাচার হতে না পারে পুলিশ সেদিকে নজর রাখবে।
রেবি ম্যাডাম কাহিনী: কক্সবাজার জেলার শীর্ষ মানব পাচারকারী হিসেবে ম্যাডাম রেবিকে সবাই এক নামে চেনে। উখিয়া উপজেলার উপকূলীয় এলাকা সোনারপাড়া গ্রামের এক সময়ের হতদরিদ্র কৃষক নুরুল কবিরের স্ত্রী রেজিয়া আক্তার আজকের রেবি ম্যাডাম হিসাবে পরিচিত। পুলিশের খাতায় নাম থাকলেও বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন মানব পাচারের মামলা থেকে। ২০১২ সাল থেকে তিনি মানব পাচারের সাথে সরাসরি জড়িত হন। তার স্বামী নুরুল কবির বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সংগ্রহ করে তার আশ্রয়ে রেখে সুযোগ বুঝে পাচার করে দিতেন। অল্প দিনেই কোটিপতির তালিকায় নাম উঠে যায় এই দম্পতির।
চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি রেবিকে মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এর আগে তার স্বামী নুরুল কবিরকে একই অভিযোগে উখিয়া থানা পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করে। রেবি জামিনে বের হয়ে ২০১৪ সালে ২৩ নভেম্বর স্বামীকে মুক্ত করার জন্য কক্সবাজার আদালত পাড়ায় তদবিরের জন্য ঘোরাঘুরি করার সময় গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তাকে আবার আটক করে। এসময় পুলিশ তার ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে ৮৪ লাখ টাকা এবং ২৭ লাখ টাকার ২টি ব্যাংক চেকও উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পুলিশ তার বিরুদ্ধে ২টি মামলা দায়ের করে। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে ফের জড়িয়ে পড়েন মানব পাচারে। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৫০ সদস্যের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে ৩টি মামলা আছে। এছাড়া কক্সবাজার সদর থানায় রয়েছে ২টি মামলা। তার স্বামী নুরুল কবিরের বিরুদ্ধেও রয়েছে মানব পাচারের ৬টি মামলা।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোছাইন চৌধুরী বলেন, স্বামী-স্ত্রী দু’জনের তত্ত্বাবধানে উপকূলীয় এলাকা দিয়ে হাজারেরও অধিক লোকজন সাগর পথে পাচার হয়েছে। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে কেউ জানে না।
১৫ রোহিঙ্গা দালাল
কুতুপালং সরকারি বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা বস্তি ও তত্সংলগ্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প মালয়েশিয়ায় মানব পাচারকারীদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কুয়ালালামপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসরত ৫ জন প্রভাবশালী রোহিঙ্গা ও কুতুপালং নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পের ১০ জন রোহিঙ্গা দালাল একটি সিন্ডিকেট গড়েছে। এই সিন্ডিকেট অনেক রোহিঙ্গাকে পাচার করেছে।
কুতুপালং-এর সাবেক ইউপি সদস্য বখতেয়ার আহমদ জানান, কুয়ালালামপুরের ৫ পাচারকারীর প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছেন কুতুপালং ক্যাম্পের ১০ রোহিঙ্গা। তাদের শিকার হয়েছে ক্যাম্পের অনেক বাসিন্দা।