অভিবাসী উদ্ধারে রাষ্ট্রগুলোর অনীহায় হতাশ জাতিসংঘ

মালয়েশিয়ার উদ্দেশে অবৈধভাবে সাগরপথে যাওয়া অভিবাসীদের মানবিক বিপর্যয়েও উদাসীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের দেশগুলো। যে কারণে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের উপকূলের কাছে আন্দামান সাগরে আড়াই-তিন মাস ধরে নৌকায় ভাসতে থাকা কয়েক হাজার মানুষের জীবন এখন চরম শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। নৌকায় খাদ্যের জন্য মারামারিতে জড়িয়ে ইতিমধ্যে একশোর বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রগুলো অবৈধ অভিবাসীদের বহনকারী নৌকাগুলো যেমন তীরে ভিড়তে দিচ্ছে না, আবার সাধারণ জেলেদেরও অভিবাসীদের সাহায্য না করার নির্দেশ দিচ্ছে। অভিবাসীদের উদ্ধারে রাষ্ট্রগুলোর চরম উদাসীনতায় হতাশা ও নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলেছে, অভিবাসীদের উদ্ধারে যত দেরি করা হচ্ছে ক্ষতি ততই বাড়ছে। রাষ্ট্রগুলোর উচিত সবার আগে এসব মানুষের জীবন বাঁচানো।

 
এদিকে, থাইল্যান্ডে সন্দেহভাজন প্রধান পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর মানব পাচার বন্ধে উপায় ও করণীয় ঠিক করতে আগামীকাল বুধবার মালয়েশিয়ায় আলোচনায় বসছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। অন্যদিকে, রাষ্ট্রগুলো যখন এসব মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসছে না সেখানে জেলেদের মতো সাধারণ মানুষই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। খবর: বিবিসি, ডয়েচে ভেলে ও দ্য গার্ডিয়ানের।
 
গত এক সপ্তাহে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় তিন হাজার অভিবাসীকে উদ্ধার করা গেছে। এখনো সাগরের বুকে ভাসছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। উদ্ধার হওয়া মানুষগুলোর কাছ থেকে জানা যাচ্ছে নিপীড়ন, অনাহার আর মৃত্যুর সব রোমহর্ষক ঘটনা। অভিবাসী সঙ্কট নিরসনে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন। তিনি বলেন, অভিবাসী সঙ্কট নিরসনে সব ধরনের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত জাতিসংঘ। আর সংস্থাটির একজন মুখপাত্র ভিনসেন্ট ট্যান বলেছেন, ইন্দোনেশিয়ায় শুক্রবার কয়েক শ’ লোক অবতরণ করার পর থেকে আর কোন অভিবাসী পাড়ে নামতে পারেনি।
 
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান তান বলেছেন, এসব মানুষকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা না থাকা খুবই খারাপ সংকেত। দেশগুলো এসব মানুষ আশ্রয় না দেয়ায় ভয়াবহ মানবিক সংকটের তৈরি হয়েছে। এসব মানুষ মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। তাদের সাহায্য করার সময় ফুরিয়ে আসছে। আমরা আশা করছি আরো অনেক নৌকা খুঁজে পাওয়া যাবে। তাদেরকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমনটা হতে দেখা যাচ্ছে না।
 
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম বলছে, সময় যত যাচ্ছে এসব মানুষের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে। থাইল্যান্ডে আইওএমের মিশন প্রধান জেফারি ল্যাবোভিচ বলেন, আমাদের হিসাবে এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ সাগরে আটকা পড়ে রয়েছে। উদ্ধার হওয়া মানুষরা জানিয়েছে, নৌকায় খাবারের জন্য মারামারি একশো জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তারা এখন তীব্র খাবার সংকটে রয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করা গেলে জরুরিভাবে খাবার সরবরাহ করা দরকার। আমরা এসব মানুষের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসার জন্য দেশগুলোকে আহ্বান জানাই। অভিবাসীদের উদ্ধারে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানিয়েছে আঞ্চলিক জোট আসিয়ানও।
 
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী ভর্তি আরো নৌকা ইন্দোনেশিয়ার দিকে আসছে। দক্ষিণ থাইল্যান্ডের জেলেরা বলেছে, তারা কমপক্ষে দুটি নৌকা ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের দিকে যেতে দেখেছে। এই অভিবাসীদের বেশির ভাগই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি। যারা মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে নৌপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে দেশ ছেড়েছিলেন।
 
সাহায্য না করতে জেলেদের নির্দেশ ইন্দোনেশিয়ার
 
অভিবাসীদের শোচনীয় অবস্থার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ সেদেশের জেলেদের নির্দেশ দিয়েছে তারা যেন ওই অঞ্চলে সাগরে ভাসতে থাকা অভিবাসীদের নৌকাগুলোর আরোহীদের কোন রকম সাহায্য না করে। ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে শুধু কোন নৌকা ডুবে যেতে থাকলে বা লোকজন সাগরে পড়ে গেলেই তাদের সাহায্য করতে। দেশটির সামরিক মুখপাত্র ফুয়াদ বাসিয়া বলেন, জেলেরা অভিবাসীদের খাবার, জ্বালানি ও পানি সরবরাহ করতে পারে। তবে তাদেরকে তীরে আনতে পারবে না। আচেহ প্রদেশের কিছু জেলেও বিবিসিকে জানিয়েছে, তাদের ভাসমান মানুষকে সাহায্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। দ্যা গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রসীমায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চারটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে অভিবাসীরা প্রবেশ করতে না পারে।
 
এদিকে মালয়েশিয়াও এসব অভিবাসীদের প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। থাইল্যান্ডের নেভিরা সহায়তা করলেও তাদের অন্যদেশের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
 
থাইল্যান্ডে সন্দেহভাজন প্রধান পাচারকারী গ্রেফতার
 
গতকাল সোমবার থাই কর্তৃপক্ষ মানবপাচার নেটওয়ার্কের সন্দেহভাজন মূল হোতাকে আটক করেছে বলে জানিয়েছে। রয়্যাল থাই পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন পাচুবান আংচোতিপানকে গ্রেফতার করেছে। তিনি দক্ষিণের সাতুন প্রদেশের প্রাদেশিক সরকারের একজন সাবেক কর্মকর্তা। থাই ন্যাশনাল পুলিশের প্রধান জেনারেল সোমিয়ত পুমপানমুয়াং বলেন, সাতুন প্রদেশে তার শক্ত নেটওয়ার্ক রয়েছে। তিনি সেখানকার প্রধান এবং তার অধীনে অনেক লোক রয়েছে। তার ডাক নাম কর তং। তার বিরুদ্ধে মানব পাচার, অপহরণসহ আরো অনেকগুলো অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
 

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের কিছু ক্যাম্প ও অভিবাসীদের গণকবর আবিষ্কারের পর বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। ৩৩টি মরদেহ উদ্ধারের পর থাই সরকার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। এ ঘটনার পর মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সরকারও তাদের সমুদ্রসীমায় নজরদারি বাড়িয়েছে। যে কারণে সাগরে ভেসে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার অভিবাসী এখন কোনো তীরে ভিড়তে পারছে না।