গাজীপুরে গৃহবধূ ও বাগেরহাটে চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ীকে হত্যার দায়ে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে গতকাল মঙ্গলবার মোট আটজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দুটি মামলাতেই চারজন করে মোট আটজনকে ফাঁসির দণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করা হয়। বাগেরহাটের খুনের মামলায় একই সাথে অপর একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
গাজীপুরে গৃহবধূ হত্যার দায়ে স্বামীসহ চারজনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-১-এর বিচারক মোঃ ফজলে এলাহী ভূইয়া জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হচ্ছেন— নিহত মোর্শেদার স্বামী ও গাজীপুর মহানগরীর চাপুলিয়া বন্নাইপাড়া এলাকার ছলিম মুন্সীর ছেলে মোঃ আবু আইয়ুব লালন (৪৫), তার সহযোগী একই এলাকার জুলহাস খানের ছেলে মোঃ হানিফ (৩২), রিয়াজউদ্দিন ভূইয়ার ছেলে মুল্লুক হোসেন ভূঁইয়া (৩৪) ও বদিউল আলমের ছেলে রানা (৩০)।
মামলার বাদী ও নিহত মোর্শেদার চাচা মো. শওকত আলী জানান, গাজীপুর মহানগরীর চাপুলিয়া বন্নাইপাড়া এলাকার মৃত মোহাম্মদ আলীর মেয়ে মোর্শেদার সঙ্গে ১৯৯৮ সালে একই এলাকার আবু আইয়ুব লালনের বিয়ে হয়। তাদের ঘরে দুটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয় : লাকমি (৮) ও ছোটন (৫)। মোর্শেদার স্বামী আবু আইয়ুব লালন একই এলাকার এক প্রাবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। মোর্শেদা বাধা দেয়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহের সৃষ্টি হয়। এর জেরে ২০০৮ সালের ৫ নভেম্বর রাতে মোঃ আবু আইয়ুব লালনের সহযোগী হানিফ, মুল্লুক ও রানা বাড়িতে এসে মোর্শেদাকে ডাকতে থাকে। মোর্শেদা দরজা খুললে কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে হানিফের কাছে থাকা ছুরি বের করে মোর্শেদার বুকে আঘাত করে গুরুতর জখম করা হয়। সে ডাক-চিত্কার করলে মুল্লুক ও রানা মোর্শেদাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় ধারালো অস্ত্রসহ হানিফকে এলাকাবাসী আটক করে। গুরুতর জখমপ্রাপ্ত মোর্শেদাকে প্রথমে গাজীপুর সদর হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পর দিন ৬ নভেম্বর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মোর্শেদা প্রাণ হারায়। মোর্শেদা চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। মৃত্যুর পূর্বে মোর্শেদা জানিয়েছিল, তার স্বামী লালনের নির্দেশে হানিফ, মুল্লুক ও রানা তাকে কুপিয়ে জখম করেছে। নিহতের চাচা মো. শওকত আলী বাদী হয়ে হয়ে স্বামী লালনসহ ৪ জনকে আসামি করে ৮ নভেম্বর জয়দেবপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা জয়দেবপুর থানার এসআই রফিকুল ইসলাম-১ ৪ জনকে অভিযুক্ত করে ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। দীর্ঘ শুনানির পর মঙ্গলবার আদালত ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রদান করে। রায়ে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রায়ে ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদী মোঃ শওকত আলী। তিনি আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন গাজীপুরের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ মকবুল হোসেন কাজল ও মোঃ আতাউর রহমান খান।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী সরোয়ার হোসেন হাওলাদারকে (৫৫) হত্যার দায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। আদালত একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আল আসাদ মো. আসিফুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা পলাতক। যাবজ্জীবন ও খালাসপ্রাপ্তরা আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেন বিচারক।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন— মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া গ্রামের আফসার খাঁর ছেলে লাবলু খাঁ (৪১), উত্তর ফুলহাতা গ্রামের আসমত আলী হাওলাদারের ছেলে হাবিবুর রহমান ওরফে হাবি ডাকাত, ছাপড়াখালী গ্রামের তালেব হাওলাদারের ছেলে আল-আমীন হাওলাদার, সূর্যমুখী গ্রামের মুজিবর হাওলাদারের ছেলে বেল্লার হোসেন।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত মোরেলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বহরবুনিয়া গ্রামের আব্দুর রব শেখের ছেলে হারুন শেখ। মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে মোরেলগঞ্জ উপজেলার উত্তর ফুলহাতা গ্রামের বশির উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী সরোয়ার হোসেন হাওলাদারকে আসামিরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে খালে লাশ ফেলে দেয়। সরোয়ার ফিরতে দেরি করায় বাড়ির লোকজন তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে তারা ওই খালে তার লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে সরোয়ারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে অভিযোগ এনে নিহতের স্ত্রী সেলিমা বেগম বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মোরেলগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।