‘মুক্তিপণের ট্যাহাও নেছে ছাওয়ালডাও গায়েব হইছে’

ভিটে-মাটি বিক্রি করে দালাল আব্দুর রোউফ এর চাহিদা অনুযায়ী ২ লাখ ২৭ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিলেও সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার জালালপুর গ্রামের হতদরিদ্র তাঁত শ্রমিক আব্বাস আলীকে (২২) ফিরে পায়নি তার পরিবার। পরিবারটি একমাত্র সম্বল বসতবাড়ি এবং ছেলে দুই-ই হারিয়েছেন। তাই দিন-রাত চোখের পানিতে বিলাপ করে তার বৃদ্ধ বাবা-মা বলে চলেছেন, নির্দয় দালালরা মুক্তিপণের ট্যাহাও নিল আবার ছাওয়ালডারেও গায়েব করে দিল।

 
এলাকাবাসী এবং হতভাগ্য যুবক আব্বাসের পরিবার জানায়, দালাল চক্রের লোভের ফাঁদে পা দিয়েছিল সে। জানুয়ারির প্রথম দিকে একই থানার ব্রাহ্মণ গ্রামের দালাল আব্দুর রোউফ এবং তার ছেলে রাসেলের কৌশলী পরামর্শে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফে গিয়ে ট্রলারে উঠে পড়ে। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। দু’মাস পরে রোউফ এবং তার আরেক সহযোগী টেকনাফের জহর দালাল আব্বাসের বাবা হজরত আলীকে জানায়, তার ছেলেকে থাইল্যান্ড নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর পরদিন আব্বাস থাইল্যান্ড থেকে জিম্মি অবস্থায় দালালদের ধরিয়ে দেয়া ফোনে তার মা ফজিলা খাতুনকে কান্নাকাটি করে জানায়, তাকে মুক্তিপণের জন্য নির্দয় নির্যাতন করা হচ্ছে। টাকা না দিলে মেরে ফেলবে। উপায় না দেখে দরিদ্র পরিবারটি ৮ শতকের বাড়িটি বিক্রি করে ২ লাখ ২৭ হাজার টাকা বেলকুচি ইসলামী ব্যাংকের  শাখা থেকে রোউফের দেয়া গৌরিপুর শাখা ইসলামী ব্যাংকের ‘‘মোশারফ জেনারেল ষ্টোর’’ নামধারী ১৫৮৮ নং অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। মুক্তিপণের টাকা দেয়ার পর থেকে ফোন করলে দালালদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। থাইল্যান্ডে গণকবরের খবর পাওয়ার পর থেকেই ছেলেকে ফেরত পাবার আশা একপ্রকার ছেড়ে দিয়েছেন আব্বাসের বাবা-মা। সব হারিয়ে চোখের পানি হয়েছে তাদের একমাত্র সম্বল।
 
এনায়েতপুর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা জিরো টলারেন্স দেখিয়ে আসছি। আব্বাসের ব্যাপারে অভিযোগ পেয়েছি। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।
 
বেঁচে ফিরেছেন ছিদ্দিক
 

মোহাম্মদ ইলিয়াস, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, মালয়েশিয়ায় চাকরির লোভে পড়ে অর্থ-সম্পদ সবই হারিয়ে ফেলেছেন লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের চাকফিরানী দুলুকের পাড়ার মৃত ইউসুফের ছেলে ছিদ্দিক আহমদ (৪৫)। দালালদের মৃত্যুকূপে গিয়েও কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন। ছিদ্দিক প্রথমে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখানে আর্থিকভাবে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফিরে আসেন। গত ১৬ এপ্রিল তিনি মালয়েশিয়া যান। পাচারকারীরা চাকরি দেয়ার নামে তাকে তিন দালালের হাতে তুলে দেয়। ১৯ এপ্রিল দালালরা তাকে নিয়ে যায় থাইল্যান্ড সীমান্তের একটি ভবনে। সেখানে দালালরা তাকে থাইল্যান্ডের একটি চক্রের হাতে বিক্রি করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। ছিদ্দিক বিষয়টি বুঝতে পারলে তার উপর নির্যাতন শুরু হয়। তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয় ২ লাখ টাকা। ছিদ্দিক তাদের পায়ে ধরে প্রাণভিক্ষা চেয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় তাদের রাজি করায়। তার স্ত্রী ভিটে-বাড়ি বন্ধক রেখে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করে কক্সবাজারের শাহ মিম আকতার নামে এক ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দেয়। ২২ এপ্রিল ব্যাংক এশিয়া কক্সবাজার শাখার ০৪৬৩৪০০৫৮৫০ নম্বর হিসেবে এ টাকা জমা হয়। থাইল্যান্ডের দালালরা টাকা পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ছিদ্দিককে ছেড়ে দেয়। সেখান থেকে কোন মতে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।