বঞ্চিত লাঞ্ছিত মানবতাকে নিত্য যিনি শোনাইয়াছেন জাগরণের গান, উজ্জীবিত করিয়াছেন অভয়মন্ত্রে, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্রোহী কবি বিশেষণে তিনি সমধিক পরিচিত। আজ ১১ই জ্যৈষ্ঠ, এই মহান কবির ১১৬তম জন্মবার্ষিকী। নজরুল সাম্যবাদী আদর্শে দীক্ষিত অকুতোভয় তেজদীপ্ত এক জীবন সাধক।
তিনি গানের বুলবুল, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কলমযোদ্ধা। তিনি দুখু মিঞা, জীবনকে দেখিয়াছেন নিদারুণ দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে দীর্ণ-শীর্ণ হইতে। সেই কারণেই হয়তো শৈশব হইতেই তিনি ছিলেন বেপরোয়া এক জীবনসন্ধানী। জীবনসত্য অন্বেষণ করিতে তিনি ছুটিয়াছেন নিরন্তর। তিনি চঞ্চল, অস্থির, কখনওবা দারুণ অভিমানী। অভিমানই তাহাকে বিদ্রোহী বানাইয়াছে। সে কথা তিনি নিজেও স্বীকার করিয়াছেন। অন্যত্র তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘এই বাঁধনহারা মানুষটি ঘরোয়া আঙিনা পেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করেছে। যে নীড়ে জন্মেছে এই পলাতক, সেই নীড়কেই অস্বীকার করেছে সর্বপ্রথম উড়তে শিখেই।’ কখনও যাত্রা দল, কখনও লেটোর দলের সঙ্গে ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগত্টাকে’ পণ করিয়া ক্লান্তিহীন ছুটিয়াছেন দেশের নানা প্রান্তে।
তাঁহার চেতনা লোপজনিত অসুস্থতা প্রকাশ পাইবার কয়েক মাস পূর্বে, ১৯৪১ সালের এপ্রিলে, কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’তে জীবনের শেষ অভিভাষণ পাঠ করিতে গিয়া কবি তাঁহার জীবনের লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেন। জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব দেখিয়া তিনি বলেন, প্রাণের ভেতরের যে সত্য, যে ধর্ম, তাহার উপর কোনো ধর্ম নাই। বাস্তবিকপক্ষেই তিনি আমাদের সেই চিরন্তন মানবতার সঙ্গীতই শোনাইয়াছেন নিরন্তর। তিনি গাহিয়াছেন সাম্যের গান। বজ্রনির্ঘোষ তিনি বলেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। আজ তাঁহার জন্ম-জয়ন্তীতে দিকে দিকে উচ্চারিত হউক মানবতা ও সাম্যের গান। সেই সাথে কামনা করি তাঁহার বিদেহী আত্মার অনন্ত শান্তি।